হোম বর্ধমানের ইতিকথাবর্ধমান ভ্রমন চলুন ঘুরে আসি বর্ধমানের সাত দেউল

চলুন ঘুরে আসি বর্ধমানের সাত দেউল

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান

পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায় প্রাচীন কালে জৈনধর্ম ছিল বঙ্গ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধর্মবিশ্বাস। পালযুগের আগে একদা পুরুলিয়া-বাঁকুড়া-বর্ধমান এলাকায় জৈনধর্মের প্রভাব ছিল অপরিসীম। বাংলার আনাচে-কানাচে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অসংখ্য জৈন মন্দির। এই মন্দিরগুলি দেউল নামে প্রসিদ্ধ। দেউল শব্দের অর্থ দেবালয় । কালের প্রকোপে এই দেউল গুলির অধিকাংশই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বর্ধমান জেলাতেও কিছু দেউল এখনো মাথা তুলে অতীতের স্মৃতিচারণ করছে। যদিও তাদের গায়ে আজ বার্ধক্যের ছাপ আর শরীর জুড়ে অবহেলার ক্ষত । যেন তারা যন্ত্রণাবিদ্ধ কন্ঠে ফিসফিস করে বলতে চাইছে ” চলে গেলে আর পাবেনা । হারিয়ে যাবে তোমার পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য “। এমনই একটি দেউল আছে বর্ধমান শহর থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে, আঝাপুরের সাত দেউল । এখানে একসময় ছিল সাত সাতটি দেউল, যার মধ্যে ছয়টি নিষ্ঠুর কালের করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে । এখন মাত্র একটি কোনোক্রমে অতীতের উৎকৃষ্ট সভ্যতার শেষ নিদর্শন রূপে টিকে আছে ।

বর্ধমান জেলার আঝাপুরের হাজার বছরের প্রাচীন জৈন মন্দির সাত দেউল।

বর্ধমান থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আঝাপুর । বর্ধমান কলকাতা কর্ডলাইনে মসাগ্রাম স্টেশনের খুব কাছেই আঝাপুর মৌজা। আঝাপুরের দেউলিয়া গ্রামে সাত দেউলের অবস্থান। নীহাররঞ্জন রায়ের ‛বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে এই গ্রাম ‘সাত দেউলিয়া আঝাপুর’ নামে উল্লেখিত। এই অঞ্চলেই রয়েছে রেখা দেউলের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। প্রায় হাজার বছরেরও পুরনো এই ‘সাত দেউল’ নামক জৈন মন্দির । কথিত আছে পালযুগের রাজা শালিবাহন এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন । উড়িষ্যার রেখা দেউল স্থাপত্য শৈলীতে ইঁট দ্বারা নির্মিত এই সাত দেউল প্রাচীন বাংলার জৈন কৃষ্টির এক অমূল্য সাক্ষ্য । মন্দিরটির ভিত পঞ্চরত্ন আলেখ্যে তৈরি। এর বিশেষত্ব হচ্ছে চতুর্দিকে বিশাল বাঁকানো সুউচ্চ টাওয়ার ও প্রবেশদ্বারে রয়েছে ধনুকাকৃতি গেট। প্রবেশদ্বারের ওপরে, বাইরের দেওয়ালে রয়েছে সুন্দর কারুকার্যখচিত চৈত্য-জানালা। মন্দিরের গঠন শৈলী থেকে নির্মানের সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী বলে মনে করা হয়। দেউলের ভিতরে কোনো বিগ্রহ বা মূর্তি নেই।

বর্ধমানের মসাগ্রাম স্টেশন

বাংলার সবথেকে প্রাচীন মন্দিরগুলোর মধ্যে দেউল অন্যতম। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে দেউল শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে। এরপর মুসলিম শাসনের পর অন্ত-মধ্য যুগে বাংলায় দেউল শিল্পে এক নবজাগরণ আসে। খ্রিস্টীয় ১৬শ-১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত এই শৈলীর মন্দিরগুলি নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে এই মন্দিরটির দেখভাল করে ভারতের পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ ( Archaeological Survey of India ) ।

ভারতীয় পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগের নোটিস

একদিনের ছোট্ট আউটিংয়ের আদর্শ স্থান এই সাত দেউল । কলকাতা ও বর্ধমান থেকে বাস ও ট্রেনের যোগাযোগ খুবই ভালো । সকাল সকাল ঘর থেকে বেরিয়ে সারাদিন এখানে কাটিযে সন্ধের মধ্যে ফিরে যান বাড়ি । দেউল সংলগ্ন একটি সুন্দর ফুলের বাগান আছে যা পর্যটকদের ভালো লাগবেই । স্টেশন থেকে একটি টোটো করে নিন । মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে যাবেন সাত দেউলে । সবুজে ঘেরা মনোরম রাস্তা চোখ দুটোকে দেবে এক অনাবিল প্রশান্তি যা আমাদের শহুরে জীবনে লুপ্তপ্রায় । সারাদিন মনপ্রাণ ভরে নিন অক্সিজেন। ঘ্রাণ নিন হাজার বছরের পুরাতন ইঁটের । অনুভব করুন অতীতের সোনালী দিনে এই দেউল চত্বরের জৈন ধর্মাবলম্বীদের ব্যস্ত জীবনকে। ফিরে যান জটিলতাহীন এক প্রাচীন জীবনযাত্রায়। অতীতের পদধ্বনি আপনার অবেচেতন মনের দরজায় কড়া নাড়াবেই ।

বর্ধমান জেলার আঝাপুরের হাজার বছরের প্রাচীন জৈন মন্দির সাত দেউল।

ভাবতে কষ্ট হয় যে, এত সুপ্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থানের নেই কোনো প্রচার , নেই কোনো সরকারী উদ্যোগ । একটি সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র হবার উপযুক্ত সম্ভাবনা থাকলেও সরকারী উপেক্ষায় জনশূন্য ও অবহেলিত স্থান হিসেবেই রয়ে গেছে। নেই কোনো খাবার ও থাকার হোটেল । নেই কোনো সরকারী গেস্টহাউসও। জনশূন্য সেই দেউলে হয়ত গিয়ে দেখবেন আপনারাই একমাত্র দর্শনার্থী । তবে মনের গহনে যে এক টুকরো চিরস্থায়ী মধুর স্মৃতি নিয়ে ফিরবেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই ।

বর্ধমান জেলার আঝাপুরের হাজার বছরের প্রাচীন জৈন মন্দির সাত দেউল।

কিভাবে পৌছাবেন সাত দেউল :
************************
হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইন ট্রেন ধরে নামুন মসাগ্রাম স্টেশন। সেখান থেকে একটা টোটো নিয়ে পৌঁছে যান সাত দেউল। বর্ধমান থেকে বাইকেও যেতে পারেন । দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার।

কোথায় করবেন মধ্যাহ্ন ভোজন ?
**************************
সাত দেউলে কোনো খাবার হোটেল নেই । মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য আসুন মসাগ্রামে । ওখানে খাবার হোটেল পেয়ে যাবেন, যেগুলির খাবার খুবই সস্তা ও সুস্বাদু । তবে হালকা খাবার ও পর্যাপ্ত জল সঙ্গে রাখুন ।

পর্যটকদের প্রতি একান্ত অনুরোধ :
**************************
দেউল চত্বরে যত্রতত্র খাবার প্যাকেট , জলের ফাঁকা বোতল, বিড়ি-সিগারেটের টুকরো, গুটকা-পানের পিক দয়া করে ফেলবেন না । দেউল গাত্রে চক বা ইঁটের টুকরো দিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার নাম খোদাই করে নিজবংশের নাম কালিমালিপ্ত করবেন না । আপনার প্রেমিক অথবা প্রেমিকার স্থান আপনার হৃদয়ে, মন্দির-মসজিদের গায়ে নয় ।

বর্ধমান জেলার আঝাপুরের হাজার বছরের প্রাচীন জৈন মন্দির সাত দেউল।
 উপস্থাপন: দিব্যসুন্দর কুন্ডু
 ছবি : অসিত মুখোপাধ্যায় 
 তথ্যসুত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা , উইকিপিডিয়া, সাতদেউল ফলক, অসিত মুখোপাধ্যায় ।
 ইমেইল : mailto:[email protected]
2 কমেন্টস
4

Related Articles

2 কমেন্টস

Rituparna Ganguly December 22, 2019 - 7:40 pm

পোস্টটি পড়ে জায়গাটা ঘুরে আসার ইচ্ছে হচ্ছে

উত্তর
Keka Kundu December 23, 2019 - 9:25 am

খুব সুন্দর পোস্ট।

উত্তর

কমেন্ট করুন