হোম বর্ধমানের ইতিকথা উজানির সতীপীঠ

উজানির সতীপীঠ

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান

গর্ভগৃহে চণ্ডিকা দেবী
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

দক্ষযজ্ঞ, সতীর দেহত্যাগ এবং একান্নটি সতীপীঠ গড়ে ওঠার কাহিনি কমবেশি সকলেরই জানা। বর্ধমান জেলায় চারটি সতীপীঠ আছে। সেগুলি হল ক্ষীরগ্রাম, বেহুলা, অট্টহাস এবং উজানি। উজানি সতীপীঠ কোগ্রামে লোচনদাসের পাট এবং কুমুদরঞ্জনের বাসস্থানের পশ্চিমদিকে, একেবারে অজয় নদের তীরে অবস্থিত। এটি মঙ্গলকোট থানার অন্তর্গত লাখুরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে। নতুনহাট পীরতলা থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে অথবা গুসকরা থেকে ১৮ কিলোমিটার পূর্বে কুনুর নদীর সেতুর আগে উত্তরদিকে নেমে যাওয়া রাস্তা দিয়ে খানিকটা গেলেই উজানি বা কোগ্রামে পৌঁছানো যায়। মন্দিরের গর্ভগৃহে কাঠের সিংহাসনের ওপর আছেন দশভূজা মহিষমর্দিনী চণ্ডিকা দেবী। বাম দিকে আছে গৌরীপট্টহীন শিবলিঙ্গ কপিলাম্বর, পাথরের বৃষমূর্তি এবং ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি। তন্ত্রচূড়ামণি নামক তন্ত্রের মতে উজানি পীঠে ভগবতীর কূর্পরদেশ পড়েছিল বলে বিশ্বাস। প্রতিদিন সকাল ছটা থেকে বেলা একটা এবং বেলা তিনটে থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। উজানির পাশেই অজয়-কুনুরের সঙ্গমস্থল।

উজানির সতীপীঠ
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে বর্ণিত ভ্রমরার দহ, মাড়গড়া, শ্রীমন্তের ডাঙা প্রভৃতি স্থানগুলি উজানিতেই। বর্তমানে সেই স্থানগুলির হদিশ পাওয়া যায় না। কথিত আছে সপত্নীপীড়িতা খুল্লনা উজানির কাছে ছাগল চরাতেন। যে স্থানে ভাত রান্না করে মাড় গালতেন সেই স্থানটি মাড়গড়া নামে পরিচিত ছিল। চণ্ডীমঙ্গলের ধনপতি দত্ত এই ভ্রমরার দহ থেকেই ডিঙায় চেপে সিংহলে বাণিজ্যে গিয়েছিলেন। আবার তাঁর পুত্র শ্রীমন্তও মঙ্গলচণ্ডীর চরণে পুজো দিয়ে সিংহলে পিতার অনুসন্ধানে যেতে ভ্রমরার দহ থেকেই সাত খানি ডিঙা ভাসিয়েছিলেন। যে স্থানে দাঁড়িয়ে সাতখানি ডিঙা দেখেছিলেন সেই স্থানটি শ্রীমন্তর ডাঙা নামে পরিচিত ছিল। সেগুলির সন্ধান বর্তমানে না পাওয়া গেলেও উজানির সতীপীঠ-কপিলাম্বর রয়েছেন স্বমহিমায়। দেবীর মূল পুজো হয় শারদীয়া দুর্গাপুজোর সময়। পুজো চলে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত। এটি সতীপীঠ হওয়ার কারণে পুজোয় আলাদা করে মূর্তি আসে না এবং নবপত্রিকা আনা হয় না। শুধু ঘট বারি আনা হয়। বছরে তিনবার ঘট বদল হয়। প্রথম ঘট আসে বৈশাখের শেষ মঙ্গলবার এবং বাৎসরিক পুজো হয়। এরপর ঘট আসে জিতাষ্টমীর পরদিন, যাকে বোধনের ঘট বলা হয়। তারপর ঘট আসে দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন। এছাড়াও বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের মঙ্গলবারে মঙ্গলচণ্ডীর পুজো হয়। এখানে বলিপ্রথা চালু আছে। দুর্গাপুজোর সপ্তমী এবং অষ্টমীতে চালকুমড়ো, নবমীতে চালকুমড়ো, কলা, আখ এবং ছাগ বলি হয়। মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীরা লৌকিক ও পৌরাণিক দেবদেবীর মিশ্রণ। লৌকিক দেবদেবীদের সঙ্গে কালে কালে যুক্ত থাকে পরিপুষ্ট গভীর আবেগ, ভক্তির উচ্ছ্বাস, অন্ধবিশ্বাসের ঐকান্তিকতা। শ্রীমন্ত এই স্থান থেকে সিংহলে যাত্রা করে সিদ্ধকাম হয়েছিলেন এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই উজানি শক্তিপীঠের প্রতি সাধারণ মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাস আজও অমলিন।

গর্ভগৃহে কপিলাম্বর, বৃষ এবং বুদ্ধমূর্তি
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
□ লেখক: শ্যামসুন্দর বেরা 
□ ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা 
□ ইমেইল : [email protected] 
0 কমেন্ট
1

Related Articles

কমেন্ট করুন