হোম বর্ধমানের ইতিকথা বর্ধমানের ঐতিহ্য বোড়োর বলরাম

বর্ধমানের ঐতিহ্য বোড়োর বলরাম

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান

কৃষি ও শস্যক্ষেত্রের অধিদেবতা হলেন বলরাম। গ্রামদেবতা বলরামের নামমাহাত্ম্যে বোড়ো গ্রামটির নাম হয় বোড়ো বলরাম। বর্ধমান শহর থেকে কৃষক সেতু পেরিয়ে দামোদরের বাঁধ বরাবর হিজলনা দিয়ে হরিপুর হয়ে যাওয়া যায়, আবার শ্যামসুন্দর-শ্যামদাসবাটি হয়েও বোড়ো বলরাম যাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যে বোড়োর বলরামের উল্লেখ আছে। এছাড়াও পাওয়া যায় মুকুন্দ চক্রবর্তীর অভয়ামঙ্গল এবং মানিকরাম গাঙ্গুলির ‘ধর্মমঙ্গল’-এ। গ্রামের মাঝখানে বলরামের মন্দিরটি ভূমি থেকে প্রায় ১৪-১৫ ফুট উঁচু চত্বরে অবস্থিত। চত্বরটি দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে হল ৮০ ও ৬৫ ফুট। প্রায় ২০০ বর্গফুট আয়তনের বলরামের মূল মন্দিরটির উচ্চতা ৪০ ফুটেরও বেশি। মন্দিরটি চত্বরের পশ্চিমদিকে অবস্থিত। প্রবেশদ্বার বাংলার খোড়ো দোচালা আকৃতির। প্রবেশদ্বারের মাথায় অলংকৃত আছে শ্রীকৃষ্ণের বঙ্কিমমূর্তি, সঙ্গে রাধা ও ললিতা ডান দিকে কৃষ্ণ এবং বাম দিকে শিব। একেবারে শীর্ষভাগে আছে দ্বিভুজ বলরামের মূর্তি। তাঁর ডান হাতে মুশল এবং বাম হাতে হল। মূল মন্দিরের নির্মাণশৈলী পীড় দেউল আকৃতির।

বলরাম বা অনন্ত বাসুদেব বিগ্রহ
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

বোড়োর বলরামের প্রতিষ্ঠার কোনো প্রামাণ্য ইতিহাস নেই। লোককাহিনি অনুসারে জানা যায় যে একদা জোত অনন্ত গ্রামের জনৈক বিপ্র স্বপ্নাদিষ্ট হন যে সন্নিহিত জলাশয়ে নিমকাঠের বিরাট গুঁড়ি আছে। সেটি তিনি যেন বলদেবের মূর্তি তৈরি করে পুজোর ব্যবস্থা করেন। স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায়। যে জলাভুমি থেকে নিমকাঠটি পাওয়া গিয়েছিল সেটি বাসুদেব দহ নামে পরিচিত হয়। লাঙলবাহী বলরাম হলেন কৃষিদেবতা। বলরামের পৌরাণিক রূপ অপেক্ষা গ্রামদেবতার লৌকিক রূপটিই মানুষের কাছে বেশি সমাদৃত। বোড়োর বলরামের বিগ্রহের ন্যায় নিমকাঠের মূর্তি বিরল এবং এরকম কোনো বিগ্রহ কোনো পৌরাণিক বর্ণনায় পাওয়া যায় না। মূর্তিটির উচ্চতা বারো ফুটেরও বেশি এবং চালচিত্র নিয়ে ষোল ফুট। বলরাম বা অনন্ত বাসুদেবের গম্ভীর আয়ত মুখমণ্ডলে আছে ঘন গোঁপ-দাড়ি এবং গোলাকার ত্রিনয়ন। মাথার ওপর তেরটি অহিছত্র আছে। দুই কাঁধে আছে মকর। মূর্তির হাতের সংখ্যা চৌদ্দ। এর মধ্যে ছ-টিতে আয়ুধ আছে। ডান দিকে নিচে থেকে ওপরের দিকে আছে চক্র, মুশল, গদা। বামদিকে আছে শঙ্খ, হল এবং ডমরু। অন্য হাতগুলি প্রসারিত নানান মুদ্রায়। আয়ুধগুলি ত্রিদেব বলরাম-সঙ্কর্ষণ, কৃষ্ণ-বাসুদেব এবং শিবের মিলিত রূপকে চিহ্নিত করে। অহিছত্রের ওপরে চালচিত্রে দুই সখী পরিবেষ্টিত হয়ে রয়েছেন জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরাম। বামদিকে গড়ুর এবং ডানদিকে হনুমান।

বোড়োর বলরামের মন্দির
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

নিত্যপুজো (দিনে দু-বার) ছাড়াও সারা বছর ধরে থাকে নানা উৎসব। নিত্যভোগে থাকে ৬ সের আতপ চালের ভাত, ১ সের আতপের পায়েস, মুগ বা বিউলির ডাল সঙ্গে ভাজাভুজি, শাক এবং নানা রকম তরকারি, ফল, মিষ্টি, পান বা সুপারি। শীতল ভোগে ১ সের দুধ, ফল ও মিষ্টি। বছরভর থাকে নানা উৎসব। অক্ষয় তৃতীয়ায় স্নানযাত্রা এবং গাজন হয়। গাজনে সন্ন্যাসীরা ‘নিজ গোত্র পরিত্যাজ্য, বলরাম গোত্র শিরোধার্য’ বলে উপবীত গ্রহণ করে। নিয়মভঙ্গের দিন মন্দির চত্বরের প্রবেশ দ্বারের উল্টোদিকে একতলা ছাদ থেকে সন্ন্যাসীরা ঝাঁপ দেয় খড়ের গাদায়। একে পাটভাঙা বলা হয়। নিয়মভঙ্গ করে ‘বলরাম গোত্র পরিত্যাজ্য, নিজ গোত্র শিরোধার্য’ উচ্চারণ করে। বুদ্ধপূর্ণিমায় বলরামের চক্ষুদান, জন্মাষ্টমীর ব্রত, রাসলীলা, পৌষ সংক্রান্তিতে বাহান্ন ভোগ, শ্রীপঞ্চমী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত উৎসব ও মেলা এবং দোল পূর্ণিমায় পঞ্চম দোল হয়। বছরভর বলরামের নিত্যসেবা সহ মন্দির পরিচর্যার জন্য বর্ধমান রাজ এস্টেট থেকে ৩৬৫ বিঘা জমি প্রদান করা হয়েছিল। কোন্‌ রাজার আমলে এই জমি প্রদান করা হয় তা অবশ্য উদ্ধার করা যায়নি। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের সময় সম্পত্তির বেশিরভাগই বেদখল হয়ে যায়। জমি থেকে আয়ও অনিয়মিত। মূল টাকা আসে মন্দির সংলগ্ন বাজারের ২৬টি দোকানঘরের ভাড়া থেকে। এছাড়া থাকে ভক্তদের দান। নিত্যভোগের দায়িত্ব পালা করে পড়ে বিভিন্ন সেবায়েতের ওপর।

মন্দিরে চত্বরের প্রবেশ পথ
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
পাটভাঙায় ঝাঁপ দেওয়ার জন্য ছাদ
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
□ লেখক: শ্যামসুন্দর বেরা 
□ ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা 
□ ইমেইল : [email protected] 
0 কমেন্ট
1

Related Articles

কমেন্ট করুন