হোম বর্ধমানের ইতিকথাবর্ধমান রাজবাড়ী জঙ্গবাহাদুরের গল্প

জঙ্গবাহাদুরের গল্প

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান
জঙ্গবাহাদুরের কাল্পনিক ছবি

নামটি তার জঙবাহাদুর । “জঙ” অর্থাৎ যুদ্ধ , আর “বাহাদুর” অর্থাৎ বীর। নিজের নামের তাৎপর্য যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দিয়েছিল আমাদের জঙবাহাদুর । বহু দুঃসাহসিক কর্মকান্ড ঘটিয়ে জঙবাহাদুর হয়ে উঠেছিল বর্ধমানের কিংবদন্তি, রূপকথার নায়ক । চলুন আজ আপনাদের জঙবাহাদুরের গল্প বলি । বর্ধমানের বিত্তশালী রাজাদের অন্যতম গর্ব ছিল বর্ধমানের হাতিশাল । ৬০-৭০ বছর আগেও সেই হাতিশালে ৯-১০ টি হাতি সব সময় থাকতো । কি সব চেহেরা এক একটা হাতির! যেন এক একটা ধূসর রঙের মূর্তিমান পাহাড় । রাজার আমলে হাতিশালের ঠিকানা ছিল ৭ নম্বর আফতাব এভিনিউ। ঠিক আজকের বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও রাজ কলেজের মাঝামাঝি জায়গায় । এর খুব কাছে শুলিপুকুরের পাড়ে রাজাদের আস্তাবল, তথা ঘোড়াশাল ছিল। রাজাদের ফিটনগাড়ির ঘোড়াগুলো এখানেই থাকতো। যাইহোক, হাতিশাল ছিল দেখবার মত জিনিস । পরপর নটা ইয়া বড় বড় আর্চের মত ঘর । এক একটা ঘরের উচ্চতা ছিল ১৫-২০ ফুট , ৪০-৪৫ ইঞ্চির মোটা মোটা দেয়াল। সামনে মোটা মোটা গরাদ। এহেন হাতিশালের এক একটি ঘরে থাকত এক একটি হাতি । হাতিগুলির কিছু ছিল সুবিশাল দাঁত যুক্ত “দাঁতাল হাতি “, কিছু ছিল দাঁতহীন আবার কিছু ছিল মহিলা হাতি , অর্থাৎ “হস্তিনী”। এদের মধ্যে পর্বত প্রমাণ বিশালাকায় একটি হাতি সবার নজর কেড়েছিল , যার নাম “জঙবাহাদুর”। শান্ত-শিষ্ট, ধীর-স্থির , সুবোধ জঙবাহাদুরের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের কাহিনী নিয়ে পল্লীকবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক একটি কবিতা লিখেছিলেন- “জঙ-বাহাদুর হাতি” । জঙবাহাদুর হাতির কর্মকাণ্ড এতটাই তখনকার মানুষদের প্রভাবিত করেছিল যে, ঐসময়ে বহু সদ্যজাত শিশুর নাম রাখা হয়েছিল “জঙবাহাদুর”। ঠিক যেমন ঐশ্বর্য্য রাই বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা জেতার পরে জন্ম নেওয়া বহু কন্যা শিশুর নামকরণ করা হয় ঐশ্বর্য্য নামে। এমনই সেলিব্রিটি হাতি হলো জঙবাহাদুর হাতি । জঙবাহাদুরের সমকালীন আর একটি হাতি ছিল যার নাম “রঙবাহাদুর”। রঙবাহাদুর ছিল খুব বদমেজাজী। শোনা যায় রঙবাহাদুরের তাণ্ডব থামাতে কয়েকটি উট পোষা হয়েছিল । অবাধ্য হাতিদের কান কামড়ে তাদের ঠাণ্ডা করত উটের দল। রাজ হাতিশালের হাতিরা হেলে দুলে কাছেই অবস্থিত গোলাপবাগে যেত । গোলাপবাগের কলাবাগানে গিয়ে গাছ ও কলা খেত । পেট পুড়ে খেয়েদেয়ে সঙ্গে বেঁধেও নিয়ে আসতো পরে খাবার জন্য । মাহুতরা হাতিগুলিকে স্নান করাতে নিয়ে যেত মিঠাপুকুরের “হাতিপুকুরে”। হাতিদের স্নান দেখতে ছেলে বুড়োদের ভিড় লাগতো পুকুর পাড়ে ।

সেই হাতিশাল এখন আর নেই, নেই কোনো হাতি । শোনা যায় না আর রঙবাহাদুরের গর্জন বা দেখা যায় না আর জঙবাহাদুরের মাথা দোলানো। রাজা ও রাজত্ব চলে গেল , এলো গণতন্ত্র । উঠে গেল সেই হাতিশাল । হাতিশাল উঠে যাবার পরে পরিত্যক্ত হাতিশালে থাকেন “রাজ এস্টেটের ম্যানেজার ধীরাজ মুখোপাধ্যায় । বাড়ির নম্বর ও ৯ থেকে বদলে হয়েছে ১৩। কিন্তু জঙবাহাদুরের কীর্তি এখনো মুছে যায়নি বর্ধমানের বৃদ্ধ বাসিন্দাদের মন থেকে । অন্য সব হাতিদের স্মৃতি বিলীন হয়ে গেলেও জঙবাহাদুর এখনও জীবিত দাদু-ঠাকুরদার নাতি- নাতনীকে বলা গল্পে । এমনই একটা গল্প বলে গেছেন বর্ধমানের পার্কাস রোডের বাসিন্দা প্রয়াত শিক্ষক কালিপদ সিংহ মহাশয় । ইংরেজ আমলে এক সাহেব এই অঞ্চলে বসবাস করতেন , যাঁর নাম পার্কার সাহেব । তাঁর নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয় পার্কার’স রোড তথা পার্কাস রোড । সেইসময়ে পার্কাস রোডে কোনো পাকা দালান ছিল না। সব মাটির ঘর, আর খড়ের চাল। এমন একটি ঘরের খড়ের চাল ভেদ করে ঢুকে পরে আশেপাশের জঙ্গল থেকে আসা একটি চিতা বাঘ । কিছুতেই তাকে বের করা গেল না। তখন তলব করা হলো জঙবাহাদুরকে । রাজশিকারী জঙবাহাদুরের পিঠে চেপে বন্দুক নিয়ে উপস্থিত হলো । শিকারী মশাই কিছুতেই চিতাবাঘ কে গুলি করতে পারছে না দেখে জঙবাহাদুর খড়ের চালের ভিতর নিজের শুঁড় ঢুকিয়ে চিতাবাঘের লেজ ধরে বের করে আনে । জঙবাহাদুরের শুঁড়ে ঝুলন্ত অবস্থায় রাজশিকারীর গুলিতে পটলডাঙার টিকিট কাটে সেই বাঘবাবাজী । শোনা যায় জঙবাহাদুরের পিঠে চেপে রয়াল বেঙ্গল টাইগারের শিকার করতেন বর্ধমানের রাজামশাই। এমনই একটি শিকার করে প্রাপ্ত ট্রফি এখন রাখা আছে কলকাতার আলিপুরে বর্ধমান রাজবাড়ি “বিজয় মঞ্জিলে”র ড্রইং রুমে । এমনই কিছু দুঃসাহসিক চমকপ্রদ বীরত্বের কাহিনীর নায়ক আমাদের জঙবাহাদুর ।

“ইকরি মিকরি চাম চিকরি,

চামে কাটা মজুমদার,

ধেয়ে এল দামোদর,

দামোদরের হাঁড়ি কুড়ি ,

গোয়ালে বসে চাল কাঁড়ি,”

এই ছড়াটি ছোটবেলায় আমরা সবাই বলেছি । কিন্তু এই ছড়া নিছকই অর্থহীন ছড়া নয় । এই ছড়ার মধ্যে তৎকালীন বর্ধমানবাসীদের মধ্যে দামোদর নদের বিভীষিকা প্রকাশ পেয়েছে । দামোদর নদকে তখন “বর্ধমানের হোয়াং হো” বলা হত । প্রায় প্রতিবছর দামোদরের বন্যায় বর্ধমান শ্মশানে পরিণত হত । সি.কে পিটারসনের “বর্ধমান ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার” এ বলছে , ১৮২৩ সাল থেকে ১৯৪৩ সালের ভিতর ৩২ বার প্রবল বন্যা গ্রাস করেছিল জনপদটিকে” । এর মধ্যে ১৯৪৩ সালের বন্যা বিধ্বংসী সংহার মূর্তি ধারণ করেছিল । অন্যবার বর্ধমান রাজাদের তৈরী রিং বাঁধের কল্যাণে ক্ষতির পরিমাণ এতটা হত না । কিন্তু ১৯৪৩ সালের বন্যায় রিং বাঁধ ভেঙ্গে গেল জলের তোড়ে । প্রয়াত শিক্ষক সুধীর চন্দ্র দাঁ মহাশয়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা গেল বর্ধমানের সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলির কথা । দুর্বার গতিতে জল ঢুকছে বর্ধমান শহরের মধ্যে , আর মানুষ ঘর-বাড়ি , জামা- কাপড় , টাকা-কড়ি ফেলে দৌড়াচ্ছে একটা উঁচু জায়গায় মাথা গোঁজার ঠাই খুঁজতে। দেখতে দেখতে গোটা বর্ধমান ১০-১২ ফুট জলের তলায় চলে গেল। বর্ধমানের সব একতলা বাড়ি ডুবে গেল । কার্জন গেটের অর্ধেক জলের তলায় । টাউন হল , কোর্ট , বীরহাটা, তেলমারুই পাড়া , সর্বমঙ্গলা মন্দির , কোনো কিছুই বাঁচলো না বন্যার করাল গ্রাস থেকে । মানুষ গাদাগাদি করে দোতলা , তিনতলা বাড়ির ছাদে , মন্দির মসজিদের ছাদে , গাছের ডালে আশ্রয় নিল । ঝড়, বৃষ্টি , রোদ মাথায় নিয়ে শয়ে শয়ে মানুষ অনাহারে , অর্ধাহারে অবর্ণনীয় দুরাবস্থায় দিন কাটাচ্ছে । এমনি করে নাকি চলেছিল প্রায় মাসাধিককাল । বর্ধমান তখন নরককুন্ড । চতুর্দিকে মানুষ ও গবাদী পশুর পচা লাশের গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। যৎসামান্য বেঁচে থাকা খাবার নিয়ে চলছে খুনোখুনি ও মারামারি।

তখন বর্ধমানের রাজা উদয়চাঁদ মাহাতাব। তিনি বন্যাত্রাণের জন্য রিলিফ ওয়ার্কে নামলেন । কিন্তু জলের তোড়ে, আর জলের কারেন্টে কোনো কিছুই করতে পারছেন না । শেষে তিনি আসরে নামালেন তাঁর হাতিদের । কিন্তু বেশিরভাগ হাতি প্রবল জলের তোড়ে ভেসে গেল । উপায়ান্ত না দেখে রাজা মশাই ডাকলেন জঙবাহাদুরকে । জঙবাহাদুর তার বিশাল পর্বতের মত শরীর জলে ভাসিয়ে হাজার হাজার মানুষ কে পিঠে করে দামোদরের উঁচু বাঁধে তুলে দিয়ে এলো । শুধু তাই নয় সেইসব মানুষদের জন্য দিনরাত বয়ে নিয়ে গেল খাবার আর পানীয় । রাতারাতি জঙবাহাদুর হয়ে গেল বর্ধমানের পরিত্রাতা ও সুপার হিরো । আজও জঙবাহাদুরের সেই গল্প বলতে গিয়ে চোখের কোন অশ্রুতে চিকচিক করে বর্ধমানের প্রবীন নাগরিকদের । কিন্তু সুখ বেশিক্ষণ বর্ধমানবাসীদের কপালে সইলো না । প্রচণ্ড পরিশ্রমের ফলে জঙবাহাদুর মারা গেল । শেষ হলো বর্ধমানের একটি রূপকথার । যদিও জঙবাহাদুরের মৃত্যু নিয়ে আরও একটা গল্প ও প্রচলিত আছে । বিশ সালের বানে জলের তোড়ে কিছুতেই বাঁধ বানানো যাচ্ছিল না । তখন রাজা জঙবাহাদুর ও রঙবাহাদুরকে জলের স্রোতের সামনে দাঁড় করিয়ে স্রোত আটকে হাতির পিছনে মাটি ফেলে বাঁধ দেওয়া শুরু করেন । সর্বক্ষণ জলে থাকার কারণে নাকি সর্দিতে মারা যায় একটি হাতি । মানুষের সেবায় হাতির এই আত্মত্যাগের কাহিনী চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন । পল্লীকবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের কবিতা “জং-বাহাদুর হাতি ” কবিতায় সেই মর্মস্পর্সী কাহিনী ফুটে উঠেছে ।
জঙবাহাদুরের কবর দেওয়া হয়েছিল অধুনা নার্স কোয়ার্টার এর নিচে । শোনা যায় করাত দিয়ে কেটে কেটে জঙবাহাদুরের শরীর ওখানে কবর দেওয়া হয়েছিল । গোটা নার্স কোয়ার্টারটাই জঙবাহাদুরের কবরের উপরে তৈরী হয়েছিল । নার্স কোয়ার্টার তৈরীর সময় যখন ভিত খোঁড়া হচ্ছিল, তখন অনেক বড় বড় মোটা মোটা হাতির হাড়গোড় বেরিয়েছিল । খবর পেয়ে রাজার হাতিশালের মাহুতরাও এসে বলেছিল এগুলোই জঙবাহাদুরের দেহাবশেষ। আবার কেউ কেউ বলেন মিঠাপুকুরের দক্ষিণের মাঠে কবর দেওয়া হয়েছিল জঙবাহাদুর কে । এবিষয়ে লোকশ্রুতি ছাড়া কোনো সঠিক প্ৰামান্য তথ্য নেই । শোনা যায় মহারাজা উদায় চাঁদ মহাতাব জঙবাহাদুরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটা প্রকাণ্ড কাঠের হাতি বানিয়েছিলেন । সেই কাঠের হাতিতে বসানো হয়েছিল জঙবাহাদুরের দুটো সুবিশাল দাঁত । সেই কাঠের হাতি রাখা হয়েছিল রাজবাড়ি “মহাতাব মঞ্জিলে” । দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন এসে দেখত সেই জঙবাহাদুরের কাঠের রেপ্লিকা আর স্মৃতিচারণ করত তার আত্মত্যাগের কাহিনী । ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গে জমিদারী অধিগ্রহণ আইন লাগু হয় । মহারাজা উদায় চাঁদ রাজবাড়ি “মহাতাব মঞ্জিল”, গোলাপবাগ , তারাবাগ সহ বহু বিষয়সম্পত্তি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারকে দান করে যান । এছাড়াও রাজপরিবারের হাজার হাজার একর জমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাজকর্মচারীদের দান করে যান । ১৯৫৮ সালে মহারাজা বর্ধমান ত্যাগ করে কলকাতার আলিপুরে রাজবাড়ি “বিজয় মঞ্জিলে” বসবাস করতে শুরু করেন। ওই সময় হারিয়ে যায় জঙবাহাদুরের অমূল্য কাঠের প্রতিকৃতি । সেই প্রতিকৃতির আজও কোনো হদিস পাওয়া যায় নি । জঙবাহাদুর বেঁচে আছে রূপকথায় , মানুষের স্মৃতিতে , মানুষের ভালবাসায় ও কিংবদন্তিতে ।

উপস্থাপন : দিব্যসুন্দর কুন্ডু
ছবি : সংগ্রহিত কাল্পনিক ছবি 
তথ্য সুত্র : "ইতিহাসের আঁকে বাঁকে" - রানা সেনগুপ্ত, "জঙ-বাহাদুর হাতি  -কুমুদ রঞ্জন মল্লিক , প্রয়াত শিক্ষক সুধীর চন্দ্র দাঁ মহাশয়ের স্মৃতিচারণ ,  প্রয়াত শিক্ষক কালিপদ সিংহ মহাশয়ের স্মৃতিচারণ  ও বিবিধ সুত্র 
কৃতজ্ঞতা : কেকা কুন্ডু, ঋতুপর্ণা গাঙ্গুলী ব্যানার্জী
ইমেইল : [email protected] 
1 কমেন্ট
3

Related Articles

1 কমেন্ট

Rituparna Ganguly December 23, 2019 - 10:22 am

ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এমন সুন্দর লেখার বাঁধুনি সত্যি অনবদ্য। ধন্যবাদ ক্রমবর্ধমান ।

উত্তর

কমেন্ট করুন