হোম বর্ধমানের ইতিকথা বর্ধমান রাজপরিবারের সোনার কালীবাড়ি

বর্ধমান রাজপরিবারের সোনার কালীবাড়ি

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান
সোনার কালীবাড়ির তোরণ
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

জমিদারি উচ্ছেদের (১৯৫৪) পর বর্ধমান রাজপরিবারের সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশই অধিগ্রহণ অথবা দান হিসেবে গ্রহণ করে রাজ্য সরকার। শেষ রাজা ছিলেন উদয়চন্দ্‌ মহতাব। মহারাজা মহতাবচন্দ্‌ নির্মাণ করান (১৮৪৯-৫১) বসতবাটি মহতাব মঞ্জিল। পাশাপাশি তৈরি হয় রাজ অন্দরমহল—রাজমহল এবং মোবারক মঞ্জিল। মোবারক মঞ্জিল ছিল রাজপরিবারের আঞ্জুমান কাছারি। বর্ধমানের শেষ রাজার দানকে স্বীকৃতি জানাতে ২৮ জুলাই ১৯৫৫-য় অন্দরমহলে গড়ে ওঠে মহারাজা উদয়চন্দ্‌ মহিলা মহাবিদ্যালয়। মোবারক মঞ্জিলে গড়ে ওঠে রাজ্য সরকারের ভূমি ও ভূমিরাজম্ব দপ্তরের কার্যালয়। রাজবাড়ি তথা মহতাব মঞ্জিলে ১৯৬০-এর ১৫ জুন পথচলা শুরু করে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্তী সময়ে গোলাপবাগ হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র এবং রাজবাড়ি হয় প্রশাসনিক ভবন। গোলাপবাগের উল্টো দিকে রমনার বাগানে বন দপ্তরের কার্যালয়। যে অংশগুলি এখনও পর্যন্ত মহতাব পরিবার তাঁদের অধিকারে রেখেছে সেগুলি মূলত দেবত্তোর সম্পত্তি। সেগুলি হল লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দির, সোনার কালীবাড়ি বা ভুবনেশ্বরী কালীবাড়ি, বিজয়ানন্দ বিহার এবং অন্নপূর্ণা-রাধাবল্লভ মন্দির। এই পর্বে আলোচ্য সোনার কালীবাড়ি বা ভুবিনেশ্বরী কালীবাড়ি।

গর্ভগৃহে মাঝখানে ভুবনেশ্বরী, ডান দিকে দক্ষিণা কালী, বামে মঙ্গলচন্ডী
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

সোনার কালীবাড়ি আলোচনা পর্বে সঙ্গত কারণেই আসে মহতাবচন্দ্‌ থেকে বিজয়চন্দ্‌ প্রসঙ্গ। মহতাবচন্দ্‌ ছিলেন রাজপরিবারের প্রথম দত্তক পুত্র (দেওয়ান পরানচাঁদ কাপুরের পুত্র চুনিলাল)। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন অকাল প্রয়াতা নয়নকুমারী (ধনদেয়ী দেবীর মা)। মহারাজের দ্বিতীয় স্ত্রী কেদারনাথ নন্দের কন্যা নারায়ণকুমারী ছিলেন সন্তানহীনা। সঙ্গত কারণেই পরবর্তী উত্তরাধিকার বর্তায় দ্বিতীয় দত্তকপুত্র আফতাবচন্দ্‌-এর ওপর। আফতাবচন্দ্‌ ছিলেন নারায়ণকুমারীর ভ্রাতুষ্পুত্র তথা বংশগোপাল নন্দের পুত্র। তিনি বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন লক্ষ্মীনারায়ণ খান্নার কন্যা বেনোদেয়ীর সঙ্গে। কিন্তু মাত্র সাড়ে চব্বিশ বছর বয়সে (১৮৮৫ খ্রি.) সন্তানহীন অবস্থায় প্রয়াত হন আফতাবচন্দ্‌। পরবর্তী উত্তরাধিকারী নিয়ে ভীষণ সংকট উপস্থিত হয় বর্ধমান রাজপরিবারে। দত্তক পুত্র গ্রহণে তিনটি পক্ষ থেকে দাবি উঠে আসে। প্রথম, রাজমাতা নারায়ণকুমারী এবং তাঁর ভ্রাতা বংশগোপাল নন্দে; দ্বিতীয়, নাবালিকা মহারানি বেনোদেয়ী দেবী এবং তাঁর পিতা লক্ষ্মীনারায়ণ খান্না এবং তৃতীয় পক্ষ হিসেবে উঠে আসেন বনবিহারী কাপুর এবং তাঁর অনুগত কর্মচারীগণ। বিস্তর টালবাহানার শেষে পরবর্তী দত্তকপুত্র হিসেবে স্বীকৃতি পান বনবিহারী কাপুরের পুত্র বিজনবিহারী, যিনি পরবর্তীকালে বিজয়চন্দ্‌ মহতাব নামে পরিচিত হন। পালিত পুত্রের চূড়াকরণের পর মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন বেনোদেয়ী দেবী। এই দত্তকগ্রহণ বিষয়ে প্রথম দিকে রাজ-পিতামহী নারায়ণকুমারীর নানা ওজর এবং বিরোধিতা থাকলেও পরবর্তীকালে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর সাবালক হয়ে কোর্ট অব ওয়ার্ডের তত্ত্বাবধানে থাকা বিশাল জমিদারির একাধিপত্য পান বিজয়চন্দ্‌। রাজ-পিতামহী থাকেন অভিভাবক হিসেবে।

সোনার কালীবাড়ির তোরণের ভগ্নদশা
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

নারায়ণকুমারী দেবী ১৩০৬ বঙ্গাব্দের (১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ) ৩০ ফাল্গুন বর্ধমানের মিঠাপুকুর অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেন ভুবনেশ্বরী দেবীর মন্দির ও সোনার কালীবাড়ি। মন্দিরটি প্রকৃতপক্ষে ভুবনেশ্বরী কালীবাড়ি হলেও সোনার কালীবাড়ি হিসেবে বেশি পরিচিত। কার্জন গেট থেকে রাজবাড়ি অভিমুখে যাবার পথে পড়ে মিঠাপুকুর মোড়। বি.সি. রোড থেকে ডান দিকে কিছুটা গিয়ে তারপর বাঁদিকে তাকালেই কালীবাড়ির সুউচ্চ তোরণটি চোখে পড়ে। তোরণের পর একটি ফাঁকা চত্বর পেরিয়ে পড়ে মূল মন্দির। এটির নির্মাণ শৈলী ঔপনিবেশিক মিশ্র এবং আঞ্চলিক রীতির। প্রবেশপথের প্রথমেই পড়ে বড়সড় নাটমন্দির। নাটমন্দিরের পর পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত বারান্দা। মন্দির এবং নাটমন্দিরের পঙ্খের কাজগুলি নজরকাড়ে। পাশাপাশি তিনটি ঘরের মাঝখানে গর্ভগৃহে রুপোর সিংহাসনে আছেন কমলাসনা অষ্টধাতুর বড়সড় চতুর্ভুজা ভুবনেশ্বরী দেবী। ডান দিকে আছেন দক্ষিণা কালী এবং বামে মঙ্গলচণ্ডী মূর্তি। ভুবনেশ্বরী মূর্তির ওপরের দিকের বাম হাতে আছে খড়্গ, ডান হাতে পদ্ম, নিচের ডান হাত অভয় মুদ্রার। দেবীর লোল জিহ্বা এবং মুণ্ডমালা নেই। শিবও নেই পদতলে। গর্ভ গৃহের পূর্ব দিকের ঘরের ঈষাণ কোণে আছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। ভুবনেশ্বরী মূর্তির নাকবরাবর নাটমন্দিরের উল্টো দিকের গেট পেরিয়ে আছে দুটি শিবমন্দির। প্রথমটি নারায়ণেশ্বর শিব। দুটি শিবলিঙ্গই সাদা পাথরে তৈরি।

ভুবনেশ্বরী মূর্তি
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

মন্দির খোলা হয় সকাল সাতটা নাগাদ। নিত্যসেবায় সব্যঞ্জন অন্নভোগে বৃহস্পতিবার ছাড়া মাছ থাকেই। প্রত্যেক অমাবস্যায় যজ্ঞ হয়। সোনার কালীবাড়ির মূল সেবাইত রাজা উদয়চন্দ্‌-এর ছোটোপুত্র প্রণয়চন্দ্‌ মহতাব। দীপাবলির বাৎসরিক পুজোপাঠে এবং যজ্ঞে প্রতি বছরই স্ত্রী, পরিজন সহ উপস্থিত থাকেন তিনি। দেবী স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত, আবাহন বা বিসর্জন নেই। ৩৫-৪০ বছর ধরে পুজোপাঠে যুক্ত আছেন শিবপ্রসাদ ঘোষাল। তিনিই বর্তমানে মূল পুরোহিত।

পুজোয় উপস্থিত আছেন প্রণয়চন্দ্‌ ও নন্দিনী মহতাব
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

নাটমন্দিরের উপরিভাগে পায়রার রাজকীয় আবাস এবং নিচে বিষ্ঠায় ছয়লাপ। খসে পড়েছে নাটমন্দিরের কিছুটা পঙ্খের কাজ। তোরণটির উপরিভাগের পঙ্খের কাজেরও একই দশা। রাজপ্রতীক এবং সিংহদুটি অক্ষত থাকলেও পাশেই গজিয়ে উঠেছে অশ্বত্থ গাছ। অবিলম্বে মেরামতি এবং রঙ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশাল প্রাসাদ সদৃশ মন্দির রক্ষণাবেক্ষণে যে আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন হয় তার অপ্রতুলতার ব্যাপারটি স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও মহতাব ট্রাস্ট নিত্যসেবা, দুর্গাপুজো এবং দীপাবলির বাৎসরিক পুজো অনুষ্ঠানগুলি বজায় রেখেছে।

নাটমন্দির
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
ঝাড়প্রদীপ
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
□ লেখক : শ্যামসুন্দর বেরা
□ ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
□ লেখা ও ছবি পাঠানোর ঠিকানা :
□ ইমেইল : [email protected]
0 কমেন্ট
1

Related Articles

কমেন্ট করুন