হোম বর্ধমানের ইতিকথা বাঁচার চেষ্টায় মানকরের কদমা

বাঁচার চেষ্টায় মানকরের কদমা

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান
মানকরের বিশালাকায় বিখ্যাত কদমা যার মধ্যে ফাঁপা অংশে আছে নানবিধ উপহার সামগ্রী ।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

মিষ্টির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। সুগারের রোগীর কাছেই সে কেবল দুষ্টু। মিষ্টিও হারতে রাজি নয়। সুগার-ফ্রি হতে হয়েছে তাকে তবু সম্পর্ক ত্যাগ করেনি। হরেক কিসিমের মিষ্টি রসনা তৃপ্তি করে চলেছে বঙ্গবাসীর। বেশ কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলকে পরিচিতি দিয়েছে সেই এলাকার বিশেষ মিষ্টি। এর সমর্থনে বাগবাজারের রসগোল্লা, জয়নগরের মোওয়া, কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া, চন্দনগর-মানকুন্ডুর জলভরা, বর্ধমানের সীতাভোগ-মিনিদানা, মানকরের কদমা, শক্তিগড়ের ল্যাংচা, বেলিয়াতোড়ের মেচা-র নাম করা যায়। মিষ্টির নামে খ্যাতির পাল্লা ভারি বর্ধমানের। সেজন্যই বর্ধমানে বোধহয় সরকারি চেষ্টায় গড়ে উঠেছে ‘মিষ্টিহাব’।

মানকরের বিখ্যাত কদমা ।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

উল্লিখিত মিষ্টিগুলির মধ্যে কদমা ছাড়া আর সবই রসনাতৃপ্তির জন্য নির্মিত। অন্যান্য উপকরণগুলির সঙ্গে চিনির পরিমাণ কমবেশি করা হয় মানুষের চাহিদার কথা ভেবে। কিন্তু কদমার কদর মনুষ্যের রসনার চেয়ে নৈবেদ্যে বেশি। দেবদেবীর যেহেতু সুগারের ব্যাপার নেই তাই সামান্য ছানার জল বাদ দিলে কদমা তৈরির একমাত্র উপকরণ হল চিনি।
সারা বছর নয়, নৈবেদ্যে কদমার চাহিদা মূলত দুর্গা থেকে কালীপুজো পর্যন্ত। এছাড়া কদমা লাগে পৌষ সংক্রান্তির সময় বাস্তুলক্ষ্মী পুজোয়। বেশিরভাগ এলাকায় নৈবেদ্যে আধুনিক শৌখিন সন্দেশ, মণ্ডা, পেঁড়া স্থান করে নিয়েছে। ফলস্বরূপ কদমার বাজারের বিস্তৃতি কমেছে। বর্ধমান জেলায় অবশ্য এখনও কদমার কদর আছে নৈবেদ্যে। শৌখিন কদমা তৈরির দক্ষতা যে তাঁদেরই আছে এই অহংকার এখনও করেন মানকরের কারিগররা।

মানকরের বিশালাকায় বিখ্যাত কদমা ।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

প্রাচীন গোপভূমের রাজধানী অমরারগড়ের পাশেই মানকর অবস্থিত। ১৭৪৪-এ বর্গি হাঙ্গামার সময় বর্ধমানরাজ চিত্রসেন রাই-এর অধীনে আসে গোপভূম। সারস্বত সাধনার পীঠস্থান হিসেবে এক সময় খ্যাতি ছিল মানকরের। কনৌজের ব্রাহ্মণরা এখানে বাস করার ফলে মানকরের খ্যাতি তখন ছড়িয়ে পড়ে। ধনবান ও বিদ্যোৎসাহী মানুষজনও ছিলেন সে-সময়। বর্গিহাঙ্গামার সময়ই মানকর ছেড়ে আসা রামানন্দ তর্কবাগীশ ছিলেন পঞ্চকোটরাজ নারায়ণ সিংহ দেবের সভাপণ্ডিত। এছাড়াও শ্যামসুন্দর গোস্বামী, হিতলাল মিশ্র, মধুসূদন গোস্বামী, ভক্তলাল গোস্বামী প্রমুখ মানকরবাসী সারস্বত সাধকের নামও পাওয়া যায়। হিতলাল মিশ্র ছিলেন বর্ধমান রাজপরিবারের কুলগুরু। মানকরের খাণ্ডারী গ্রামের জমিদার হিতলাল ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ভদ্রাসন ‘রংমহল’-এ দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। অবহেলায় পড়ে থাকা বহু প্রাচীন মন্দির ছড়িয়ে আছে মানকরে। উল্লেখযোগ্য শিব মন্দিরগুলি হল মানিকেশ্বর, মল্লিকেশ্বর বুড়োশিব ইত্যাদি। এ সমস্ত কিছুই এই জনপদের প্রাচীনত্বকে এবং সমৃদ্ধিকে সমর্থন করে।

মানকরের বিখ্যাত কদমা তৈরীর প্রথম ধাপ, চিনি গরম করা ।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

ধর্মীয় অনুশাসন এবং ভাবাবেগই মানুষকে গ্রন্থিত করে এসেছে চিরদিন। এই ভাবনা থেকেই পুজোর উপাচার হিসেবে কোনো এক সময় তৈরি হয় কদমা। মানকরে কদমা তৈরির কৌশল নিয়ে কারিগরদের দীর্ঘদিন ধরে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উৎকর্ষ আনে এবং ‘কদমা মানেই মানকর’ এই খ্যাতি এনে দেয়।
সময়ের পরিবর্তনে পুজোর নৈবেদ্যে সন্দেশ-পেঁড়া-ছানার মুড়কির আধিপত্য ছোটো করে দিয়েছে কদমার বাজার। এক সময় মানকরের সমস্ত মিষ্টির দোকানে কদমা তৈরি হলেও এখন সাকুল্যে তৈরি হয় তিন-চারটি দোকানে।

মানকরের বিখ্যাত কদমা তৈরীর দ্বিতীয় ধাপ, চিনি জমে এলে পাটা থেকে তুলে মণ্ডটিকে একটি ঝোলানো আঁকশিতে আটকে ঝুলিয়ে লম্বা করা হয়।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

পঞ্চকালীতলার বুড়োর দোকান হিসেবে পরিচিত দোকানের বর্তমান মালিক-কাম-কদমা কারিগর হলেন দীনবন্ধু হালদার। প্রায় নব্বই বছরের পুরোনো ব্যবসা তাঁদের। তাঁর বাবা অজিত হালদার ছিলেন প্রতিবন্ধী মানুষ কিন্তু কদমা তৈরিতে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। মানকর হাটতলায় কদমা তৈরির দুটি বড়ো দোকান আছে। একটি কর এবং অন্যটি দাস পরিবারের। কদমা তৈরির পদ্ধতি চাক্ষুস করা এবং বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া গেল দীনবন্ধু হালদারের কাছ থেকে।
বর্ষায় এবং খুব গরমের সময় কদমা তৈরি করা যায় না। এর জন্য চায় হালকা শীতের শুকনো আবহাওয়া। উপকরণ হল চিনি, জল এবং সামান্য ছানার জল। প্রয়োজন মতো জলে চিনি ফুটিয়ে সামান্য পরিমাণে ছানার জল দেওয়া হয়। ঠিক মতো পাকে এলে তা নামিয়ে বাড় উঁচু কাঠের পাটায় ঢালা হয়। জমে এলে পাটা থেকে তুলে মণ্ডটিকে একটি ঝোলানো আঁকশিতে আটকে ঝুলিয়ে লম্বা করা হয়। ঝুলে লম্বা হওয়া শেষ প্রান্তটি আবার আঁকশিতে আটকে টেনে লম্বা করা হয়। এভাবে বার বার টানলে সেটি একসময় সাদা এবং ফাঁপা হয়ে যায়। একটা সময় পর ময়দার মতো চিনির গুঁড়ো মাখানো পাটার ওপর সেটিকে রেখে হাতে করে টেনে টেনে বার বার ভাঁজ করতে হয়। সেটি চওড়া এবং পাতলা হলে দু-প্রান্ত দুহাতে ধরে মাথার ওপর চেপে গোল আকার দেওয়া হয়। এরপর দুপ্রান্ত জুড়ে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়। এই টানার সংখ্যাই কদমাকে হালকা এবং মানসমৃদ্ধ করে। যত বেশি টানা হবে কদমার ওপর তত বেশি শির তৈরি হবে। মানসমৃদ্ধ একটি বড়ো কদমায় ১০০৮ শির থাকতে হয়। কদমা বিভিন্ন আকারের হয়। ছোটো কদমা দেওয়া হয় নৈবেদ্য সাজাতে। দেবতার কাছে মানত করা এক-দু কেজি থেকে পনেরো কেজি পর্যন্ত বিশেষ কদমাও তৈরি হয়

মানকরের বিখ্যাত কদমা তৈরীর তৃতীয় ধাপ, চিনির গুঁড়ো মাখানো পাটার ওপর সেটিকে রেখে হাতে করে টেনে টেনে বার বার ভাঁজ করতে হয়।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

মানকরে এখনও যাঁরা কদমা তৈরি করেন তাঁরা ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নৈবেদ্যের পাশাপাশি উপহার সামগ্রী হিসেবে কদমা তৈরি করেন। পুজোয় মানত করা বড়ো কদমার মধ্যে ঘণ্টা, পুজোর শাড়ি, গামছা ইত্যাদি দেবার চাহিদা যেমন থাকে তেমনি বিয়ে, অন্নপ্রাশন প্রভৃতি সামাজিক অনুষ্ঠানে বিশেষ কদমা তৈরির বরাত আসে। বিয়ের তত্ত্বে বড়ো কদমার ভেতর রুপোর সিঁন্দুর কৌটো, কাপড়, পিতলের মূর্তি, দানসামগ্রী থেকে শুরু করে সোনার গহনা পর্যন্ত দেওয়া হয়। কদমা ভাঙলে বেরিয়ে আসে উপহারগুলি।

মানকরের বিখ্যাত কদমা তৈরীর চতুর্থ ধাপ, গরম অবস্থাতেই মাথার সাহায্যে বড়ো কদমাকে গোল আকার দেওয়া হচ্ছে।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

বর্ধমানের রানিগঞ্জবাজার এলাকায় বেশ কয়েকটি কদমার দোকান আছে। এখানকার কদমা তৈরি হয় স্থানীয় এলাকাতেই। বর্ধমানে তৈরি বড়ো কদমার ভেতর ফাঁপা বা অন্যান্য সামগ্রীর বদলে থাকে খই।
নৈবেদ্যে চাহিদা কমা, অন্যান্য শহর গঞ্জে তৈরি হওয়া ইত্যাদি কারণে মানকরে কদমা তৈরি থেকে বেশিরভাগ দোকানদারই হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। শ্রমসাধ্য কিন্তু লাভজনক নয় এই সত্যকে মেনে নিয়ে নতুন প্রজন্ম কদমা তৈরির দিকে এক কদমও এগোচ্ছে না। শৌখিন কারিগরের অভাব শিল্পটিকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। পুজোর উপাচারের পাশাপাশি উপহার সামগ্রী উদরে ধারণ করিয়ে কোনো রকমে টিকিয়ে রেখেছেন মানকরের কদমা শিল্পীরা।

□ লেখক : শ্যামসুন্দর বেরা
□ ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
□ লেখা ও ছবি পাঠানোর ঠিকানা :
□ ইমেইল : [email protected]
1 কমেন্ট
3

Related Articles

1 কমেন্ট

Rituparna Ganguly December 22, 2019 - 7:45 pm

শ্যামসুন্দর বাবুর লেখনি খুবই ভালো ..আরো লেখা চাই

উত্তর

কমেন্ট করুন