হোম বর্ধমানের ইতিকথাবর্ধমান ভ্রমন বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্ট ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত মার্কিন এয়ারফিল্ড -এ ঝটিকা সফর

বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্ট ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত মার্কিন এয়ারফিল্ড -এ ঝটিকা সফর

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান
বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্ট

‘নতুন অচেনা কোনো জায়গায় গেলে মানুষ শিশু বয়সের বিস্মিত হওয়ার মতো অনুভূতিটি ফিরে পায়।’ দার্শনিক বিল ব্রাইসনের এই উক্তিটি যে কতখানি সত্যি তা প্রতিটি ট্রিপে উপলব্ধি করি।
কলেজের ক্যান্টিনে তিন বন্ধু আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎই কাছেপিঠে ঘুরতে যাবার প্রসঙ্গ উঠল। কিছুক্ষন তর্কবিতর্কর পর বর্ধমান শহরের ২৮ কিমি উত্তরে “ওরগ্রাম ফরেস্ট” -কে আমাদের ঝটিকা সফরের গন্তব্য ঠিক করলাম। গুগুল ঘাটাঘাটি করে জানলাম যে ওরগ্রাম ফরেস্ট এরিয়ার ভিতরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি পরিত্যক্ত মার্কিন এয়ারফিল্ড রয়েছে। এটা শুনে আমার আর এক বন্ধু এতটাই খুশি হল যে পারলে ক্যান্টিনেই একটু নেচে নেয়। বেচারার এয়ারফোর্সের পাইলট হবার শখ ছিল ষোলো আনা কিন্তু বাদ সাধে ওর চশমার কাঁচ। যাইহোক ঠিক হল আমরা চার বন্ধু এবং এক দাদা মিলে ২রা জুলাই সকালে আমাদের কাঙ্খিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেব কিন্ত বিধি বাম ১লা জুলাই থেকে বৃষ্টির জন্য আমরা ২,৩ তারিখ বাড়ি থেকে বেরোতেই পারলাম না, অবশেষে ৪ঠা জুলাই আবারো বৃষ্টির জন্য অনেক টালবাহানার পরে বেলা ১২ নাগাদ আমরা বর্ধমান থেকে ওরগ্রামের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করলাম।

বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্ট

মসৃণ কালো পিচের বুক চিরে ছুটে চলতে চলতে কোথায় যেন হারিয়ে গেছিলাম সম্ভিত ফিরে পেলাম বাইকের টার্ন ইন্ডিকেটরের তীক্ষ্ণ শব্দে। ওরগ্রাম বাসস্টপেজ থেকে একটু এগিয়ে ডান দিকে রাস্তা ধরে আমরা ওরগ্রাম জঙ্গলের দিকে এগোতে থাকলাম,, কিছুদূর যাবার পর দূরের জঙ্গলের রেখা নজরে এল। আরো কিছুটা যাবার পর বাঁদিকে জঙ্গলের ভিতরের লাল মোরাম রাস্তা, রাস্তার পাশেই কংক্রিটের ফলক জেলা বনদপ্তরের বার্তাবাহক হয়ে ওরগ্রাম ফরেস্টে আপনাকে স্বাগত জানাবে। জঙ্গলের বিশাল বিশাল উই এর ঢিবি, লাল মাটির ভেজা রাস্তা এবং রাস্তার দুইপাশে সুউচ্চ শাল, অর্জুন, আকাশমনি গাছের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললে যদি আপনার স্বর্গানুভুতি না হয় তাহলে মানতেই হবে আপনার চোখ থাকতেও আপনি অন্ধ। এছাড়াও জঙ্গলের ভিতর পাখির অবিশ্রান্ত কাকলি আপনার মনের মধ্যে যে ভালোলাগা সৃষ্টি করবে তা হয়তো আপনি ভিড়ে ভর্তি কোনো নামকরা টুরিস্ট স্পটে পাবেন না। বর্ষার কারনে জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করা এককথায় অসম্ভব হয়ে গেছিল তাই রাস্তার থেকেই কিছুক্ষন জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করে আমরা জঙ্গলের ভিতরের রাস্তা ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত মার্কিন এয়ারফিল্ডের খোঁজে এগিয়ে চললাম। উফফ! সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ছবির মতো এই পথ ধরে যেতে যেতে বারে বারে চোখ আটকে গেল সবার অলক্ষে, অযত্নে বেড়ে ওঠা রঙবেরঙের জংলি ফুলের সৌন্দর্যে। মাঝেমধ্যে চোখে পড়ল স্বর্ণলতার মোহময়ী রূপ।

1944 সালে তোলা বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্টের পাশেই মার্কিন এয়ারফিল্ডে দাঁড়িয়ে A B-24 ফটোম্যাপিং এয়ারক্রাফট ।
ফটো : ফ্র্যঙ্ক বন্ড (Frank Bond)

ক্রমশ জঙ্গল পাতলা হয়ে এসে মোরাম রাস্তা একটা জায়গায় শেষ হল যেখান থেকে ডানদিকে একটা ভাঙা পিচ রাস্তা শুরু হয়েছে। কিন্ত একি! ভাঙা পিচ রাস্তা হঠাৎই অস্বাভাবিক চওড়া হয়ে সোজা যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে (প্রায় চার লেনের সমান) যা জঙ্গলের মধ্যে বড়ই বেমানান। যাইহোক এটা কিসের রাস্তা ও কেন এত চওড়া তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি করতে করতে প্রায় ৫০০ মিটার যাবার পর নিজেরা এই সিদ্ধান্তে এলাম যে এটাই হয়তো সেই এয়ারফিল্ডের পরিত্যক্ত রানওয়ে। সেই ভাঙা রাস্তা ধরে আরো প্রায় ৭০০-৮০০ মিটার যাবার পর বেশকিছুটা দূরে কয়েকটি উঁচু উঁচু ভাঙা দেওয়ালের অংশ নজরে এল। ভাঙা দেওয়াল গুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি আবার জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য ছিল।

1944 সালে তোলা বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্টের পাশেই মার্কিন এয়ারফিল্ডে দাঁড়িয়ে A B-24 24th কমব্যাট ফটোম্যাপিং এয়ারক্রাফট ।
ফটো : ফ্র্যঙ্ক বন্ড (Frank Bond)

বিস্তীর্ণ ন্যাড়া মাঠের মধ্যে ভাঙা দেওয়াল দেখে বুঝলাম ওখানেই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই এয়ারফিল্ড, যা দেখার জন্যই ভরা বর্ষার দিনে দুচাকা বাহন নিয়ে এতদূর আসা। পিচ রাস্তা থেকে বাঁদিকে একটি কংক্রিট রাস্তা সেই ভাঙা দেওয়াল ঘেরা জায়গার দিকে গেছে অগত্যা আমরা সেই রাস্তা ধরে এগোতে থাকলাম কিছুদূর যাবার পর বর্ষার কারনে কোনটি রাস্তা কোনটা গর্ত বোঝা দূরসাধ্য হয়ে গেল তাছাড়া প্রায় ৭৫ বছরের পুরাতন রাস্তার অবস্থা কেমন থাকবে তা সহজেই অনুমেয়। অতঃপর কিছুটা অফরোড ড্রাইভিং করেই সেই ন্যাড়া মাঠের মধ্যে আমরা প্রবেশ করলাম এইবার আর বুঝতে অসুবিধা হল না এটিই সেই “গুসকরা এয়ারফিল্ড”।

1944 সালে তোলা বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্টের পাশেই মার্কিন এয়ারফিল্ডে দাঁড়িয়ে A B-24 24th কমব্যাট ফটোম্যাপিং এয়ারক্রাফট ।
ফটো : ফ্র্যঙ্ক বন্ড (Frank Bond)

এয়ারফিল্ডের মাঝে আরো একটি রানওয়ে মত সোজা পিচ রাস্তা যদিও তা আগের পিচ রাস্তার অপেক্ষায় দৈর্ঘ্যে প্রস্তে অনেকটাই কম। এই রানওয়েটা ঘিরে বেশ কয়েকটি কংক্রিটের রাস্তা বেরিয়ে ভাঙা দেওয়াল গুলিতে মিশেছে বুঝতে অসুবিধা হল না ভাঙা পাঁচিল গুলি আদতে তৎকালীন সময়ের বিমান রাখার জায়গা ছিল। এছাড়াও একটি দোতলা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখলাম যা বেসের ভিতরের রানওয়ের বেশ কাছে যা এয়ারফিল্ডের অফিস অথবা বিমান পরিচালন টাওয়ার হবার সম্ভাবনাই বেশি। স্থানীয় একজন বললেন কিছুটা দূরে একটি নালা পেরিয়ে ভিতরের জঙ্গলে গেলে এয়ারফিল্ডের মেস, ব্যারাক ও গোলাবারুদ মজুত রাখার জায়গার ধ্বংসাবশেষ দেখা যাবে। যদিও নালাটি জলপূর্ণ থাকায় সেটি পেরিয়ে ওপারে জঙ্গলের ভিতরে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
এই প্রসঙ্গে বলে নি, আমাদের মধ্যে এক বান্ধবীর সেই সপ্তাহেই ১৯তম জন্মদিন ছিল তাই আমরা রানওয়েতেই কেক কেটে তার জন্মদিন পালন করলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী এয়ারফিল্ডে জন্মদিন উদযাপন বেশ রোমাঞ্চকর কি বলেন?

বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্টের পাশেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত মার্কিন এয়ারফিল্ড ।
ছবি : ফিরদৌসি খাতুন

আকাশ আরো কালো মেঘে ভরে যাচ্ছে আরো কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছা থাকলেও আবহাওয়ার জন্য সম্ভব হল না। বাড়ির পথ ধরলাম। ফিরতে ফিরতে আমার এয়ারফোর্স প্রেমী বন্ধু এয়ারফিল্ডের ইতিহাস জানার জন্য এককথায় অস্থির ছিল,, বাড়ি ফিরে মনে হয় ফ্রেশ না হয়েই সে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল ঘন্টাখানেক পর ফোন করে উত্তেজিত গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি সৌম্য দা কে কনফারেন্স কলে নে,, দারুন সব জিনিস জানতে পেরেছি” আমি সৌম্য দাকে কনফারেন্স কলে নিলাম বন্ধুটি বলে চলল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রের এক টুকরো ইতিহাস।

□ এবার এয়ারফিল্ডের ইতিহাস পড়ুন Rajarshi (Monfaquira) Basu এর লেখা থেকে-

উইঢিবির জংগলে কার এবং কেন মাথায় এল এই এয়ারস্ট্রিপ বানানো কথা? বর্ধমানের আকাশে কখনো ব্লিৎস্ক্রিগ হয়েছে বলেও শুনিনি। তবে মনে হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে পূর্ব এশিয়ার প্রেক্ষাপট ঘিরে এই ওরগ্রামের মাটিতে এক অন্যতম পরিচ্ছদ রচিত হয়েছিল,যা অত্যন্ত অবহেলায় বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে। হয়ত ভারতের সেইসময়কার ঘটনার নিরিখে এই ইতিহাস গর্বের নয় তবুও এই ইতিহাস জানা দরকার।কারণ, ইতিহাস ইতিহাসই, পচ্ছন্দ অপচ্ছন্দের ধার ধারে না।

□ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ -১৯৪২ ও সিবিআই।

সময় বড় সংকুল ছিল তখন।পার্ল হারবার বোমা বর্ষণের পর আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধ এ যোগ দিল ।কিন্তু আমেরিকা পদাতিকের থেকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছিল বায়ুসেনার ওপর.১৯৪২ সালে পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধ এর জন্য জন্ম হল,CBI Theatre (China Burma India)। ভারতের জন্য কম্যান্ডার ইন চিফ হলেন আর্কিবল্ড ওয়াভেল। ৮ই মার্চ,১৯৪২,জাপান রেঙ্গুন দখল করল এবং বার্মা হয়ে উঠল পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধ এর মুল ভরকেন্দ্র। এর পরপরেই ১৪ই এপ্রিল ১৯৪২ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান খবরদার (Coordinator of Information) উইলিয়াম ডোনাভান Detachment 101 নামক মিশন শুরু করেন। এদের কাজ ছিল, জাপানী ফৌজের খবর জোগাড় করা,গেরিলা যুদ্ধে বিব্রত করা,বায়ুসেনার বোমা বর্ষণের জন্য নিশানা চিনহ্ন ইত্যাদি। কিন্তু কয়েকশ মার্কিন সেনার পক্ষ্যে এই সব করা সম্ভব হচ্ছিল না।তাহলে উপায় ?

□ বাজপাখীর ক্যামেরা বা গুগল ম্যাপের আদিকথা ওরগ্রাম।

১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ সালে সান আন্তোনিও,টেক্সাস এ ভূমিষ্ট হল 8th Photographic Reconnaissance Group যা পরে নাম বদলে হয় 35th Photographic Reconnaissance Group । ডাক নাম “রেড হক” বা “লাল বাজ”। এদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হল বোমারু বিমানের সাহায্যে আকাশ থেকে বিপক্ষ বাহিনীর চলাচল বা পজিশনের ছবি তোলা,অকুস্থলের ম্যাপ নির্মাণ,টেরেন মডেলিং ,আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির আপডেট নিয়ে পদাতিক ও বায়ুসেনাকে সরবরাহ করা । যদিও এটা ছিল Non Combat Wing কিন্তু প্রয়োজনে এরা বোমাও ফেলতে পারত কারণ বিমান গুলি আদতে বোমারু । এরা ব্যবহার করত F7/F5/Lockheed Martin F5E/F6/P40 বিমান। এই পুরো বাহিনী নিয়োগ হয়েছিল শুধুমাত্র বার্মা,চীন,ইন্দোনেশিয়া আর থাইল্যান্ডে নজরদারীর জন্য। এবং এবার আসা যাক সেই প্রসংগে যার জন্য এই ইতিহাসের উপস্থাপনা। এই বাহিনীর প্রথম ও শেষ গন্তব্য – আজ্ঞে হ্যাঁ ,ওপরে যে জায়গার কথা লিখেছিলাম- সেই ওরগ্রাম এয়ারবেস- মার্কিন যুদ্ধ ইতিহাসে যার পোশাকি নাম- গুসকরা এয়ারফিল্ড।

□ গুসকরা এয়ারফিল্ড এর গোড়ার কথা।

উইলিয়াম ডোনাভানের Detachment 101 মিশন শুরুর সাথে সাথেই মার্কিন বায়ুসেনার সদস্যরা ভারতে আস্তে শুরু করে। আম্বালার রয়েল এয়ারফোর্সের ছাউনি হয়ে প্রথমে কাচড়াপাড়া। “Detachment 101″ এর অন্তর্গত কাজ হিসাবে এমন একটি এয়ারবেস বানানোর সিদ্ধান্ত হয় যা মুল যুদ্ধ ক্ষেত্রের সীমানার বাইরে, কিন্তু এমান একটি স্ট্র্যাটেজিক জায়গায় যেখান থেকে মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য -আকাশপথে নজরদারী -তা চালানো সম্ভব ।কলকাতা থেকে অনতিদূরে,গুসকরার জঙ্গলে শুরু হল এয়ারবেস বানানোর কাজ। মার্কিন সেনাবাহিনীর বরাত Services of Supply এর হাত ঘুরে পৌঁছাল ব্রিটিশ সরকারের কাছে। ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে কাজ শুরু করল ভারতীয় ঠিকাদাররা। ওরগ্রামের সাঁওতাল কুলীদের লাগানো হল। ১৯৪২ সালে শুরু হয়ে ১৯৪৪ সালের জানুয়ারী মাসে শেষ হল কাজ। এয়ারবেস , ব্যারাক,মেস,সেলুন সব প্রস্তুত। গুলি চালানোর জন্য চাঁদমারীও প্রস্তুত। অবশেষে ৫ই জানুয়ারী ১৯৪৪ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর ১০ম এয়ারফোর্স বেস রুপে জন্ম হল গুসকরা এয়ারফিল্ড। কাজ শুরু করল 20th Tactical Reconnaissance Squadron P40 বিমান নিয়ে যা চলল ২৬শে মার্চ ১৯৪৪ অব্ধি। মাঝে আরো কিছু স্কোয়াড্রন, বোমারু বিমান এল , কিন্তু এক পারদর্শী কম্যান্ডারের অভাবে ঠিক ঠাক কাজ এগোচ্ছিল না । অতঃপর আগমন ঘটল ,”লাল বাজের ” সবচেয়ে স্বরনীয় নেতার ।

□ উইলিয়াম গারা ওরফে টনি ।

এন্থনি আলেন গারা ওরফে টোনি। মার্চ ৩০ ১৯১৭ সালে জন্ম। স্থান হাডসান্ডেল। বাবা রবার্ট মা এডিথ। পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অরণ্যবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক। কিন্ত উনি ছিলেন পেশাদার চিত্রগাহক। ১৯৩৯ সালে পাশ করে বেরোলেন। কিন্ত যুদ্ধএর অশনি সংকেত ঘনিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বন বাদাড়ের বিজ্ঞানী কে কে চাকরি দেবে? উনি আমেরিকা জুড়ে ছবি তুলে বেড়াতেন। ওনার আরেক বৈশিষ্ট ছিল উনি জমি জরিপ আর ম্যাপ তৈরীর কাজ ভাল জানতেন। ১৯৪২ সালে আমেরিকা যখন সরাসরি যুদ্ধ এ যোগ দিল, ওনার প্রতিভা চাপা থাকল না। উনি Army Air Corps,14th Airforce, Flying Tiger হিসাবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জন্য গঠিত স্কোয়াডে, যার পোশাকি নাম ছিল China Burma India (CBI) Theatre এ Chief of the Photogrammetric mapping Section যোগ দিলেন। এটি ছিল ১৯৪২ সালে বিশেষ ভাবে গঠিত 35th Photo Reconnaissance Squadron এর অংশ। আগেই লিখেছি এদের কাজ ছিল বার্মার যুদ্ধ এর সময় বিমানের মাধ্যমে অকুস্থল এর ছবি তোলা,ম্যাপ বানানো, সেনাবাহিনী কে তা সরবরাহ করা এবং দরকার পড়লে বম্বিং ও। ওনার প্রথম পোস্টিং কাঁচরাপাড়া। ১৯৪৪ সালের গ্রীষ্ম মাসে উনি এলেন ওখানে।

1944 সালে এয়ারক্রাফট থেকে তোলা বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্টেরর পাশেই মার্কিন এয়ারফিল্ডের রানওয়ে ।
ফটো : গ্লেন এস হেন্সলি (Glenn S. Hensley
)

□ শেষের কথা

১৯৪৫ সাল অব্ধি ,টোনির নেতৃত্বে কাজ চলল এই মিশনের । যুদ্ধ তখন চরমে ।তাই শুধু নজরদারীর জন্য না রেখে মার্কিন বায়ুসেনা উড়িয়ে নিয়ে এল 93rd Fighter Squadron, 81st Fighter Group, (Republic P-47 Thunderbolt বিমান সহ ) এবং 426th Night Fighter Squadron, January – August 1945 (Northrop P-61 Detachment বিমান সহ)। ১৯৪৫ সালের আগষ্ট মাসের হিরোশিমা নাগাসাকির বোমা বর্ষণের পর হল জাপানের আত্মসমর্পন। প্রয়োজন ফুরালো নজরদারীর। মার্কিন বায়ুসেনারা বিদায় নিল অথ ব্রাত্য গুসকরা এয়ারফিল্ড থেকে আগস্ট মাসেই।
আজ ৭৪ বছর এই বিস্মৃতি বুকে নিয়ে পড়ে আছে সেই কংক্রিটের রানওয়ে আর চাঁদমারি। প্রায় কেউ জানে না এর বোবা ইতিহাস বা সেই সাঁওতাল কুলীদের শ্রমের কথা। শালের জংগলের মধ্যে দিয়ে চাঁদ আলোকিত করে তার প্রসস্ত বুক আর হেঁটে যায় বা বিশ্রাম নেয় শ্রান্ত নেকড়ে আর ধীরে ধীরে ইতিহাস ভঙ্গুর হয়ে মিশে যায় লাল মাটিতে।
আগেই লিখেছি ,ইতিহাসের ভাল খারাপের দায় নেই।শুধুমাত্র অতীতের ঘটনা বর্তমানের সামনে তুলে ধরা তার কাজ ।কোন আয়নায় দেখবেন তা আপনার একান্ত নিজস্ব। তাই এই ইতিহাসের সাক্ষী হতে আপনিও আস্তে পারেন ওরগ্রামের জংগলে ,যেখানে আপনার পা রাখার জায়গায় একসময় নিঃশ্বাস নিত F5/7/5E/P40 বোমারু বিমান আর ওই যে বাজ টা উড়ছে দেখলেন ওইখানে উড়ত লখহিড এফ-৫ এর “লাল বাজের ডানা”। আর ঐ যে যেখানে গরু চড়ে বেড়াচ্ছে ওখানেই হয়তো P40 বোমারুর পাইলটরা বসে যুদ্ধের নকশা বানাতো।

বর্ধমানের ওরগ্রাম ফরেস্টেরর পাশেই মার্কিন এয়ারফিল্ডের রানওয়ে ।
ছবি : ফিরদৌসি খাতুন

□ কিভাবে যাবেন?

বর্ধমানের নবাবহাট বাসস্টপ থেকে বাঁচার দিকে বেঁকে বর্ধমান-বোলপুর রোড হয়ে ওরগ্রাম বাসস্টপেজ সেখান থেকে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস পায়ে হেটে অথবা ওরগ্রাম বাসস্টপেজ থেকে টোটো রিজার্ভ করে। বাস/ট্রেনে আসতে চাইলে বর্ধমান থেকে বোলপুর/গুসকরা গামী বাসে ওরগ্রাম বাসস্টপেজ। ট্রেনে বর্ধমান থেকে গুসকরার সেখান থেকে বাস বা টোটোতে ওরগ্রাম। জঙ্গলের ভিতর এয়ারফিল্ড খুঁজে পেতে স্থানীয়দের সাহায্য নিন। গুগুল ম্যাপ লিঙ্ক https://goo.gl/maps/xZqpRoaCPQy

□ থাকার ব্যবস্থা

আপনি চাইলে ফরেস্ট অফিসের বাংলোতে রাত্রি যাপন করতে পারেন। বুক করতে হয় বর্ধমান জেলা পরিষদ অফিস থেকে।

□ আমাদের বানানো এয়ারফিল্ডের একটি ভিডিও:

(বৃষ্টির জন্য ডিএসএলআর বের করতে পারিনি তাই বেশি ছবি নেই জায়গাটির সম্পর্কে আপনাদের পরিস্কার ধারনা দেবার জন্য মোবাইলে ভিডিও করেছি কোয়ালিটি ইস্যু থাকলে দুঃখিত এবং অনেক বড় সাইজের জন্য ইউটিউব লিংক দিলাম)

প্রতিবেদন : ফিরদৌসি খাতুন
ছবি : ফিরদৌসি খাতুন
তথ্যসূত্রঃ
১. Archives of 35th Photo Reconnaissance Squadron
2.Tony Garra Trip Journal
3.Airfield Construction - Historical Records of the Engineering Section of Construction Service at CBI.
4.Bond Photograph Library & Hensley Photograph Library-University of Chicago.
5.Wikipedia.
ইমেইল : [email protected]
2 কমেন্টস
3

Related Articles

2 কমেন্টস

Rituparna Ganguly December 22, 2019 - 7:42 pm

ঘরের কাছে এত সুন্দর একটা জায়গা আছে জানতাম না ..ধন্যবাদ সুন্দর লেখাটির জন্য

উত্তর
Keka Kundu December 24, 2019 - 6:08 pm

খুব সুন্দর ভ্রমণ কাহিনী।

উত্তর

কমেন্ট করুন