হোম বর্ধমানের ইতিকথা ‘বর্ধমানের বিধান রায়’ ডাক্তার শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

‘বর্ধমানের বিধান রায়’ ডাক্তার শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান

খুঁজে খুঁজে ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’, ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’, ‘ফাদার্স ডে’, ‘মাদার্স ডে’-র মতো একাধিক দিবস পালনের হিড়িক তোলার কৃতিত্ব সোস্যাল মিডিয়ার। ভুবন জুড়ে বাজারের লক্ষ্যেই এই সমস্ত দিবস পালনের আয়োজন। অবশ্য পরিবেশ দিবস, চিকিৎসক দিবস ইত্যাদি হল দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যতিক্রমী পালনীয় দিন। মানুষের জীবনে ডাক্তারের ভূমিকাকে সম্মান জানাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দিনে পালিত হয় ‘ডক্টর’স ডে’। আমাদের দেশে ১৯৯১ সালের ১ জুলাই থেকে দিনটি পালনের উদ্দেশ্য হল ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়কে স্মরণ করা। জাতীয় স্তরে যাঁকে স্মরণ করে ‘ডক্টর’স ডে’ পালন, তাঁর জনপ্রিয়তা সহজেই অনুমেয়।

প্রশ্ন হল, যে রাজ্যে বাঙালির সবচেয়ে বড় পুজোর মণ্ডপে ডাক্তারকে অসুর সাজানো হয়, রোগীমৃত্যুকে ঘিরে পরিজনের দ্বারা সর্বত্র নিগ্রহের শিকার হন ডাক্তাররা, যেখানে বর্ধমানের বিস্তীর্ণ ডাক্তারপাড়াকে ডাকাতপাড়া বলা হয় খোলাখুলিভাবে—সেখানে ‘ডক্টর’স ডে’ পালনের যৌক্তিকতা কি আদৌ আছে? উত্তর হল, যৌক্তিকতা নেই বলে ছেড়ে দিলেই কি ডাক্তারদের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায়! একদিকে যেমন অসুস্থ মানুষের সেবায় নিঃস্বার্থ এবং সততার সঙ্গে অনুকরণীয় হিপোক্রিটাসের শপথনামা সব ডাক্তার কার্যক্ষেত্রে মনে রাখেন না অন্যদিকে, সব ডাক্তারই ডাকাত বা কসাই—এমনটা ভাবা বোধ হয় বাড়াবাড়িই।

ডা: শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

বিধানচন্দ্র রায়ের খ্যাতির মাপকাঠিকে মনে রেখে ‘বর্ধমানের বিধান রায়’ নামে খ্যাত হয়েছিলেন ডাক্তার শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। জন্মেছিলেন ১৯০৭-এর ১০ ফেব্রুয়ারি, জামালপুর থানার ইলসরা গ্রামে। বাবা সুরেন্দ্রনাথের রেলের চাকরির সূত্রে সব পড়াশোনাই কলকাতায়। প্রথমে হেয়ার স্কুল, তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজের কৃতী ছাত্র মেডিকেল কলেজের প্রসূতি বিভাগ ছাড়া সব বিষয়েই প্রথম স্থানাধিকারী হয়ে এম.বি. পাশ করেন ১৯৩১ সালে। হাউস সার্জেন হিসেবে কাজ করেন সে-সময়ের প্রখ্যাত শল্যচিকিৎসক কর্নেল অ্যান্ডারসনের অধীনে। হাত পাকিয়েছিলেন কর্নেল হার্নেট জুডো প্রমুখের সহযোগিতায়। সে-সময় প্রেসিডেন্সি জেনারেল হসপিটালে (পরবর্তীতে এস.এস.কে.এম.) চিকিৎসা হত সাহেবদের। কোনো ভারতীয় চিকিৎসক ছিলেন না। শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ই প্রথম (১৯৩৪) এই হাসপাতালে দেশীয় চিকিৎসক-অধ্যাপক (অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি) নিযুক্ত হন। সরকারি চাকরির সূত্রেই শিক্ষক হিসেবে বর্ধমানে আসেন (১৯৩৭) রোনাল্ডসে মেডিকেল স্কুলে। তাঁর দক্ষতার প্রতি বিশেষ আস্থা ছিল কর্নেল অ্যান্ডারসনের। ১৯৩৯-এ বাংলার গভর্নর লর্ড ব্র্যাবোর্ন-এর অস্ত্রোপচারে সহকারী হিসেবে ডাক পান কর্নেল অ্যান্ডারসনের। সাহেবের অপারেশনে সাহায্য করা তাঁর খ্যাতিকে বাড়িয়ে দেয় অনেক গুণ। ১৯৪৩-এ চট্টগ্রামে বদলির আদেশ এলে চাকরিতে ইস্তফা দেন। পরে অবশ্য ১৯৪৫-এ অনারারি সার্জেন হিসেবে যোগ দেন বর্ধমানের ফ্রেজার হাসপাতালে। স্বাধীনতার পর এটির নাম হয় বিজয়চাঁদ হাসপাতাল। স্বেচ্ছাবসর নেন ১৯৬০-এ। অবশ্য ১৯৪৩-এ খোসবাগানে বর্ধমানের প্রথম নার্সিং হোম গড়ে তোলেন। এটিই ১৯৫০ সালে রানিসায়রের কাছে বড় আকারে তৈরি হয়। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর খ্যাতি রাজ্য ছাড়িয়ে যায়। কোনো অপারেশনই বাদ রাখেননি তিনি। এমনকি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাবার ক্যাটারাক্ট অপারেশনও করেছিলেন তিনি। প্রয়াত হন ১৯৯০ সালের ৯ জানুয়ারি। মুখ্যমন্ত্রী তথা চিকিৎসক-অধ্যাপক বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর সম্বন্ধে একটি মিথ চালু আছে : তিনি ‘বর্ধমানের বিধান রায়’। তাঁর এই খ্যাতি কেন? এ-প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল তাঁর চিকিৎসক পুত্র অমিতাভ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে বর্ধমান থেকে রোগী চিকিৎসার জন্য গেলে ডাক্তার রায় পরামর্শ দিতেন শৈলেন মুখোপাধ্যায়কে দেখাতে।

ডা: শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

শুধু শল্যচিকিৎসক হিসেবে অর্থোপার্জন করে জীবন অতিবাহিত করলে বর্ধমানের মানুষের কাছে কিংবদন্তী হয়ে উঠতেন না শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। চিকিৎসার বাইরে শিল্প এবং সামাজিক কাজকর্মের বিরাট ব্যাপ্তিতে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। মানুষের শরীরে ছুরি-কাঁচি ধরেছিলেন পেশার তাগিদে আর সেই তিনি রং-তুলি ধরেছিলেন নেশার টানে। হেয়ার স্কুলের আঁকার শিক্ষক ক্ষীরোদ ভট্টাচার্যের কাছে শুরু হয়েছিল শিল্পের হাতেখড়ি। নিসর্গ প্রকৃতিকে ক্যানভাসে ধরার প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। খোসবাগানের তিনতলা বাড়ির বিভিন্ন অংশে রাখা ‘ইভনিং ইন কাশ্মীর’, ‘হিলিস্কেপ’, ‘বনপথ’, ‘হিলি ওয়ে’, ‘দীঘির এক কোণে’, ‘বনপথে এলো বনহরিণী’, ‘শান্তির দূত’, ‘গুরুদেব ও গান্ধী’ নামাঙ্কিত শিল্পকর্মগুলি নজর কাড়ে। তাঁর শিল্প প্রীতির আরও নিদর্শন মেলে এখানে। ১৯৫৪-তে জমিদারি উচ্ছেদের সময় কেনা রাজবাড়ি থেকে কেনা ফরাসি শিল্পীর দুটি বড় তৈলচিত্র, মূর্তি ও অ্যান্টিক জিনিস চোখে পড়ে এই বাড়িতেই। ১৯৬৩ সালে নিজের নার্সিং হোমের নিচেই গড়ে তুলেছিলেন বর্ধমান আর্ট কলেজ। শুরু করেন পুষ্প ও চিত্র প্রদর্শনীর। সেই আর্ট কলেজ অবশ্য অধুনালুপ্ত।

ডা: শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা

তাঁর সামাজিক কাজকর্মই অমর করে রাখবে শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে। নিজের গ্রাম ইলসরায় সুরেন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র, আদিবাসী ছাত্রাবাস গড়ে তুলেছিলেন তিনি। বর্ধমানের মূক-বধির স্কুলের প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনিই। গুসকরা মহাবিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের গবেষণাগার, বিবেকানন্দ মহাবিদ্যালয়, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল, মেমারি কলেজ, রবীন্দ্রভবন, সিএমএস স্কুল, ভারতী বালিকা বিদ্যালয়, শ্রীরামকৃষ্ণ-সারদাপীঠ উচ্চবিদ্যালয়, হরিসভা বালিকা বিদ্যালয় তাঁর আর্থিক সহায়তায় তৈরি বা পুষ্ট হয়েছিল। জন্মশতবর্ষে ১৯৮২ সালের ২৮ ডিসেম্বর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় বিধানচন্দ্র রায়ের পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন করে। শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের আর্থিক সৌজন্যে মূর্তি তৈরি করেছিলেন ভাস্কর হরিহর দে।
রবীন্দ্রনাথের ‘কঙ্কাল’, ‘নিশীথে’ গল্পের কলমসৃষ্ট চরিত্র শশিশেখর, হারান ডাক্তাররাও ‘আনএথিক্যাল’ কাজের নজির রাখে। বাস্তবের কিছু ডাক্তারের অর্থগৃধ্নুতার কাছে হার মেনেছে ‘মেডিক্যাল এথিক্স’, ‘হিউম্যান এথিক্স’। তাই বলে সব ডাক্তার একই দোষে দুষ্ট এটা কষ্টকল্পনা। কিছু ডাক্তার অবশ্যই এখনও আছেন যাঁরা মানুষকে সারিয়ে তোলার কাজটি চালিয়ে যান পেশার প্রতি অবিচার বা অসম্মান না করে।

ডা: শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি।
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
লেখক : শ্যামসুন্দর বেরা
ছবি : শ্যামসুন্দর বেরা
লেখা ও ছবি পাঠানোর ঠিকানা :
ইমেইল : [email protected] 
1 কমেন্ট
4

Related Articles

1 কমেন্ট

Rituparna Ganguly December 22, 2019 - 7:47 pm

শৈলেনবাবুর মত ডাক্তার খুবই কম দেখা যায় এখন

উত্তর

কমেন্ট করুন