হোম বর্ধমানের ইতিকথা বড়শুলের শুভেন্দ্রমোহন বাবুর ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা

বড়শুলের শুভেন্দ্রমোহন বাবুর ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান
বড়শুলের শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালায় বর্ধমান রাজ পরিবারের শতাব্দী প্রাচীন ক্ষুদ্র বিলিতি শব্দকোষ।
ছবি : দিব্যসুন্দর কুণ্ডু

একটি ছোট্ট শব্দকোষ নিয়ে আজ আমাদের গল্প । ভাবছেন নিশ্চই , “ধুর মশাই ! একটা শব্দকোষ নিয়ে কি আবার গল্প হবে?”। উঁহু!, যে সে শব্দকোষ নয় এটি । একশো বছরেরও পুরনো বর্ধমান রাজ পরিবারের সংগ্রহে থাকা অমূল্য গ্রন্থ ভাণ্ডারের অন্যতম একটি গ্রন্থ এই শব্দকোষ । এবার নিশ্চই একটু একটু ইতিহাসের গন্ধ পাচ্ছেন ? পাওয়াই স্বাভাবিক । এক ইঞ্চি বাই এক ইঞ্চি আয়তনের এই অতি ক্ষুদ্র শব্দকোষটি স্বচক্ষে দেখলে আপনার চক্ষু চড়কগাছ হতে বাধ্য । শব্দকোষের অক্ষরগুলি খালি চোখে পড়তে পারবেন না , লাগবে আতস কাঁচ । ইংল্যান্ডের গ্লাসগো শহরের ছাপাখানায় তৈরী এই ক্ষুদ্র শব্দকোষে ইংরাজি থেকে ইংরাজি শব্দের অর্থ এত সুনিপুণ ভাবে ছাপা আছে যে আপনি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না। । বর্ধমানের রাজারা হামেশাই বিলেত যেতেন । এঁদেরই কেউ বিলেত থেকে আনেন এই শতাব্দী প্রাচীন শব্দকোষ, যা এক কালে বর্ধমানের রাজবাড়িতে শোভাবর্ধন করতো। এখন সেটি শোভাবর্ধন করছে বর্ধমান শহর থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দুরে শক্তিগরের বড়শুলের হিমাদ্রি শংকর দে মহাশয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়।

বড়শুলের শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালায় তালপাতা ও তুলোট কাগজের প্রাচীন পুঁথি।।
ছবি : দিব্যসুন্দর কুণ্ডু

শক্তিগড় স্টেশন থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দুরে বড়শুলের দে বাড়ি । একডাকে তল্লাটের সব্বাই চেনেন এই জমিদারবাড়ি। এককালে বর্গীদের আক্রমন থেকে বাঁচাতে হিমাদ্রি বাবুর পূর্বপুরুষরা বানিয়েছিলেন এই পেল্লাই দূর্গের মত জমিদার বাড়ি । বাড়িতে পা দিলেই টের পেয়ে যাবেন যে অতীতে জাঁকজমক কম ছিলনা এই বাড়ির। উঁচু উঁচু পিলার , কড়ি-বর্গার ছাদ, নক্সা করা বার্মা সেগুনের দরজা-জানালা, সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ কাঠ দিয়ে বাঁধানো। এহেন বাড়ির দোতলায় হিমাদ্রিবাবু বানিয়েছেন তাঁর সাধের সংগ্রহশালা । বাবার নামে নাম দিয়েছেন ‘শুভেন্দ্রমোহন দে ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা।’পেশায় ব্যবসায়ী হিমাদ্রিশংকর দে ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার আকর্ষণে একক প্রচেষ্টায় নিজের বাড়িতেই সযত্নে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন এই সংগ্রহশালা। সারা বাংলা ছুটে বেড়ান প্রাচীন জিনিস সংগ্রহের কাজে। ‘ক্রমবর্ধমান’থেকে গিয়েছি শুনেই পরম আগ্রহে খেতে বসেও উঠে এসে দরজা খুলে আমাদের বসতে দিলেন । মিনিট দশেকের মধ্যে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে আমাদের নিয়ে ঢুকলেন তাঁর ব্যক্তিগত জাদুঘরে ।
এরপর ঘন্টাখানেক আমাদের যে কিভাবে কেটে গেল টেরই পেলাম না । একটার পর একটা প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য ঐতিহাসিক বস্তুতে মিউজিয়াম ভর্তি । একটা ঘোর কাটতে না কাটতেই উনি দেখাতে লাগলেন অন্য একটা । রানি ভিক্টোরিয়ার ব্যাক্তিগত চিঠি, ১৯০৩ সালের দাশরথি রায়-এর পাঁচালি, বর্ধমান মহারাজার আমলের একটি টাইপ মেশিনের পূর্বপুরুষ, ব্রিটিশ আমলের প্রকান্ড বড় তালা , হ্যারিকেন , বিশাল স্টেপলার, স্পিরিট ল্যাম্প , টাইটানিক জাহাজের সমবয়সী আমেরিকান কলম, বহু পুরনো কোডাক ক্যামেরা , প্রাচীন পেন্ডুলাম ঘড়ি ও বহু মূল্যবান অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য বস্তু ।

বড়শুলের শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালায় প্রাচীন বিলিতি দোয়াত, টাইটানিকের সমবয়সী বিদেশী পেন , ও অন্যান্য প্রাচীন ঐতিহাসিক সামগ্রী।
ছবি : দিব্যসুন্দর কুণ্ডু

এছাড়াও সংগ্রহশালায় রয়েছে তালপাতা ও তুলোট কাগজের প্রাচীন পুঁথি। যা গবেষকদের কাছে বাইবেল পরিগণিত হতে পারে । রয়েছে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক কালের বহু দুষ্প্রাপ্য ডাক টিকিট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় থেকে ষষ্ঠ জর্জ আমলের মূল্যবান দলিলপত্র, পোস্টকার্ড, কৃষ্ণনগর মহারানির চিঠি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই । ১০২টি অক্ষর লেখা একটি চাল হিমাদ্রিবাবু পরম যত্নে আলমারী খুলে আমাদের দেখালেন । ব্রিটিশ আমলের বহু পুরনো রেস কোর্সের টিকিট , দে পরিবারের বিয়ের কার্ডে লেখা কবিতা , হিমাদ্রি বাবুর দাদু স্বর্গীয় গোপেন্দ্রকৃষ্ণ দে মহাশয়ের “রায় সাহেব ” উপাধি প্রদানের ব্রিটিশ সরকারের চিঠি , বর্ধমানের মহারাজার অভিনন্দন বার্তা ইত্যাদি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম । এছাড়াও বহু পুরনো মুদ্রা , স্ট্যাম্প , পোস্ট কার্ড ও বিভিন্ন রাজবাড়ির আমন্ত্রণ পত্রে ভর্তি এই সংগ্রহশালা। রানী ভিক্টোরিয়ায় আতরের শিশির কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে । খালি আতরের শিশি খুলতেই অদ্ভুত এক রাজকীয় সুবাসে আমার ঘ্রানেন্দ্রিয় মাতাল হয়ে গেল । এ এক অদ্ভুত মাদকতাময় পুরনোকে ফিরে পাবার অনুভূতি । ইতিহাস কে ছুঁয়ে , অনুভব করে টেরই পাইনি কখন ঘড়ির কাঁটা আড়াইটে ছুঁয়েছে ।

বড়শুলের শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালায় ব্রিটিশ আমলের বিদেশী কোডাক ক্যামেরা, মাইক্রোস্কোপ , স্টপ ওয়াচ ও অন্যান্য প্রাচীন সামগ্রী।
ছবি : দিব্যসুন্দর কুণ্ডু

এবার বাড়ি ফেরার পালা । মন না চাইলেও ফিরতে হলো বাড়ি । মনের গহনে এক টুকরো চিরস্থায়ী মধুর স্মৃতি নিয়ে বাইক স্টার্ট করলাম । হিমাদ্রিবাবুকে শুভেচ্ছা বা অভিনন্দন দিয়ে খাটো করলাম না। যেভাবে তিনি এক মুঠো ইতিহাস নিজের ঘরে একার উদ্যোগে সঞ্চয় করেছেন তার কোনো তুলনা হয়না । ক্রমবর্ধমানের তরফ থেকে হিমাদ্রিশংকর দে মহাশয়কে জানাই স্যালুট । জীবনানন্দ দাশের ভঙ্গীমায় গেয়ে উঠলো মন, আবার আসিবো ফিরে এই বড়শুলের জাদুঘরে ।

বড়শুলের শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালায় হিমাদ্রিশংকর দে দেখাচ্ছেন তালপাতা ও তুলোট কাগজের প্রাচীন পুঁথি।।
ছবি : দিব্যসুন্দর কুণ্ডু

□ কিভাবে যাবেন শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালা :
কলকাতা থেকে বর্ধমানগামী লোকাল ট্রেন ধরে শক্তিগড় স্টেশনে নেমে পড়ুন । স্টেশন থেকে টোটো বা রিক্সা ধরে পৌছে যান বড়শুল। শক্তিগড় স্টেশন থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দুরে শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালা। বর্ধমান থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দুরে । সবথেকে সহজ বাইকে যাওয়া । এছাড়াও বাস ট্রেন বা টোটো ধরে বর্ধমান থেকে যেতে পারেন । ফেরার পথে শক্তিগড়ের ল্যাংচা খেতে মোটেও ভুলবেন না ।

□ শুভেন্দ্রমোহন দে সংগ্রহশালার ফোন নম্বর :
৯৬৭৯১১৭০৩৩, ৮৪৩৬৩৮৩৩৬৪
□ উপস্থাপন: দিব্যসুন্দর কুণ্ডু 
□ ছবি : দিব্যসুন্দর কুণ্ডু  
□ তথ্য সুত্র :  হিমাদ্রিশংকর দে
□ কৃতজ্ঞতা : ঋতুপর্ণা গাঙ্গুলী ব্যানার্জী  ও কেকা কুণ্ডু 
□ ইমেইল : [email protected] 
1 কমেন্ট
3

Related Articles

1 কমেন্ট

Rituparna Ganguly December 23, 2019 - 10:24 am

অসাধারণ, কিন্তু সঠিক সংরক্ষণ এর প্রয়োজন।

উত্তর

কমেন্ট করুন