হোম ভোজনবিলাস খেয়ে-বেড়ানো!

খেয়ে-বেড়ানো!

প্রকাশক ক্রমবর্ধমান

এই লেখাটা বেড়ানো নিয়ে নয়। আসলে এবারে আমরা কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে বেড়াতে যাই নি, মানে ওই আর কি! কোনো জায়গায় গিয়ে এই এই দেখবো, এই এই সময়ে এখানে যাবো এসব কিছু ঠিক করে যাই নি। শুধু ঠিক করেছিলাম তিনটে জায়গায় যাবো, পাঁচদিন শুধু সেখানে গিয়ে শুয়ে-বসে-খেয়ে কাটিয়ে ফিরবো। ঠিক যেমনটা চেয়েছিলাম তাইই হয়েছে। শুধু বাড়তি পাওনা সব জায়গায় মনের মতো খাওয়া, যা আমাকে শুধু খাওয়া নিয়ে লিখতে বাধ্য করলো।এটা আমার ‘খাদ্য-লোভী আমি আর আমরা কয়েকজন’ নিয়ে লেখা। আসলে ওই কয়েকটা দিন আমরা কয়েকজন কি অদ্ভুত ভাবে খাদ্য-রসিক হয়ে উঠেছিলাম তার কথা। আছে তার সাথে কিছু মানুষজন যারা আমাদেরকে এই হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল তাদের কথা। আর আছে আমাদের এমন কিছু কথা বা বাক্য যা নিয়ে আজও আমরা আলোচনা করি। আমি তিনটে ভাগে সেই বিখ্যাত তিনটে বাক্য নিয়ে পর্ব গুলোর নাম রেখেছি।

আমরা রাক্ষস হয়ে যাই কেন? (পর্ব:১)

ফোনটা এসেছিল ঠিক সকাল আটটার সময়। চাদর ঢাকা দিয়ে প্রায় ঘুমের দেশে থেকেই ধরলাম।

– বলছি, দুপুরে কি খাবেন?
– মানে!
– দুপুরে এসে ভাতের সাথে কি খাবেন?
– যা খুশি করুন। অতো জিজ্ঞাসা করার কি আছে?
– আচ্ছা, আচ্ছা! মাছ ভাত করে দি তাহলে।
– ঠিক আছে, যা মন করুন।

যাই হোক, সঙ্গীদের জানাতেই আমায় তো এই মারে, সেই মারে! কি হলো রে আবার! কেউ বলে হালকা করে ঝোল আর একটু ভাজা বলতে পারতে। বউ বলে, ছেলের জন্য একটু কষা করে একটা কিছু বলতে পারতে। আমি এসব কিছু আর শুনছি না। ভাবছি আটটা যদি বেজেই যায় তাহলে আমি ট্রেনে কি করছি! ট্রেন তো শিলিগুড়ি পৌঁছে যাবার কথা আর আমারও এই সময় নেমে শিলিগুড়ি স্টেশনের সামনের গলিতে বসে গরম গরম আলু-পরোটা খাওয়ার কথা। তাহলে একটু খুলেই বলি। এবারের বেড়াতে যাওয়ায় আমাদের একটুও কোনো জায়গায় তাড়াহুড়ো কিছু ছিল না, কারণ এবার আমরা পাহাড়ে যাবো না, যাবো লাটাগুড়ি। কাছেই, তাই কোনো তাড়া নেই। গাড়ি বলা আছে পার্থকে। ট্রেন থেকে নেমে খেয়ে-দেয়ে ধীরে সুস্থে যাবো। অন্যবার তো ট্রেন থেকে নেমেই ছুটতে হয় যাতে যত তাড়াতাড়ি পারি পাহাড়ে পৌঁছাতে। যাই হোক, উঠে মুখ ধুয়ে চা খেয়ে বুঝলাম যে দার্জিলিং মেল প্রায় দু-ঘন্টা লেট চলছে তাই বাকিরা আমায় ওঠায় নি। চা-বিস্কুট খেয়ে আমি ভাবতে লাগলাম, আমি কার সাথে ফোনে কথা বললাম। এবার একটু একটু করে মনে পড়লো সবই। আচ্ছা, আমি পবনদার সাথে কথা বললাম। কে পবনদা? সে সব পরে জানা যাবে, আপাতত এটুকুই জানি যে পবনদা হলো আমরা লাটাগুড়িতে যে রিসোর্টটায় থাকবো এবার তার ম্যানেজার। যাই হোক, ওসব ভাবার এখন সময় নেই, খিদে পেয়েছে বেশ। সবারই পেয়েছে। ট্রেন থেকে নেমেই কিছু খাবার ইচ্ছা ছিল। যদিও কুশ কোনোভাবে আমাদের গাড়িতে চাপিয়েই গাড়ী ছেড়ে দিল। একটু রেগেই গেলাম। বললো, চলুন একটু, তারপর খাবেন। গাড়ী ছুটলো, সুন্দর রাস্তা, পাশে তিস্তা ক্যানেলের সবুজ জল। মন ভরে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার তো এতো সহজে শান্তি হয় না। পেট ভর্তি না থাকলে আমার আর আমার ছেলের কোনো কিছুই ভালো লাগে না। এসে পৌছালাম, তিস্তা ব্যারেজ সংলগ্ন এলাকা

গজলডোবায়। রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটা ধাবা। একটায় ঢুকলাম। খিদেয় পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে আর মাথায় আগুন জ্বলছে। কি খাই, কি খাই! তাড়াতাড়ি হবে একটাই, ওয়াই ওয়াই। তাই হোক! বলেই খুঁজতে লাগলাম পাশে আর কি পাওয়া যায়। যায়, যায় রাস্তার পাশে অনেক কিছু পাওয়া যায়। নাক সিঁটকানোর কিছু নেই। আমি সব খাই। ওমা, দেখি আমার সাথে ম্যাডামও খান সবই। কি পাওয়া যাচ্ছে? বিভিন্ন মাপের চিংড়ি ভাজা, কিছু চিংড়ি ভাজা মিশিয়ে বেসন দিয়ে বড়া, আরো কত কিছু হাবি-জাবি কি সব। অতো দেখার সময় নেই আমার।
-ওই দুটো গরম গরম দুটো বড়া দাও তো!
নিলাম, খবরের কাগজের উপর তেল চুপ চুপে দুটো বড়া। ভাবলাম কেউ হয়তো খাবে না। শুধু এনে টেবিলে রাখার অপেক্ষা। দেখার আগেই উড়ে গেল। একটুকরো গরম মুখে ফেলেছি আর এক টুকরো ভাঙার চেষ্টা করছি, এমন সময়

– হ্যালো! বলছি মাছ কি কাতলা না অন্য কিছু করবো? আলু ভাজা ঝুরো ঝুরো করবো না পোস্ত দিয়ে গোটা গোটা করে ভাজবো?
ভাবা যায়। মুখে গরম বড়া আর তাতে কুচো চিংড়ির খোঁচা দু গালে লাগছে আর জিভ পুড়ছে ঠিক তখনই ফোন পবনদার!
– দাদা, পারলে আপনি ছাগলের মুন্ডু ভেজে রাখুন। আমার যা খিদে পেয়েছে আমি গিয়েই আপনাকে সমেত জল দিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নেব।
– হ্যা হ্যা! কি যে বলেন! আসুন আসুন, তাড়াতাড়ি আসুন।
আমি মাইরি বাপের কালে কোনো হোটেলের ম্যানেজার কে এরকম করে আপ্যায়ন করতে শুনি নি। কিরকম এক মন ভালো হয়ে গেল।পৌঁছানো মাত্র হাতে ধরিয়ে দিল গরম চা।
মানে?
– আরে চা টা খেয়ে চান করুন, দিয়ে আসুন জমিয়ে ভাত খাবেন।তার আগে আমি ছোটটার জন্য গরম বেগুন ভাজা, ডাল, মাছ ভাজা আর একটু কিছু দিচ্ছি, খাইয়ে দিন।
একে মাইরি যতো দেখছি ততো অবাক হয়ে যাচ্ছি।

যাই হোক, চান করে দুপুর দুটোয় আরণ্যকের ডাইনিং রুমের শেষ প্রান্তে সবথেকে বড় টেবিলটায় পবনদার নির্দেশ মত বসে নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এই এতো কমসময়ে, কমকথায় লোকটা সবার জন্য এই ব্যবস্থা করলো কি করে!
যাই হোক, ওসব ভাবনা দুপুরে রুমে বসে ভাববো না হয়! এখন শুধু খাওয়া। তার আগে শুধু একটা ছবি!

– ধপ ধপে সাদা সরু চালের সুগন্ধী ভাত, চাকা চাকা পাতলা করে কাটা উচ্ছে অল্প কড়া করে ভাজা, কড়ি আঙুলের মাপে কাটাআলুর সাথে বরবটি কলাই গোটা পোস্ত মিশিয়ে নরম করে ভাজা, অনেক সবজি মিশিয়ে পুরু ডাল, আলু-গাজর-বেগুন-শিম মিশিয়ে উত্তরবঙ্গের সেই বিখ্যাত বারেলি মাছের তরকারি, কাঁচকলা, আলু আর বড়ো কাতলা মাছের পেটি দিয়ে হালকা ঝোল দেখে আমি যখন আর কারোর দিকে তাকাবার কথা ভাবিনি এবং মনোযোগ সহকারে খেয়ে চলেছি পবনদা তখন আমার সামনে আরো তিনটে প্লেট এনে হাজির। টক আমের সাথে কাজু, কিসমিস মিশিয়ে অল্প মিষ্টি চাটনি যাতে মনে হলো যেন একটু তেঁতুল ও মেশানো ছিল, কুচো হলুদ তিনকোনা পাঁপড়, আর শেষ বাটিতে ছিল রাজভোগ (নলেন গুড়ের রসগোল্লাগুলো এক একটা টেনিস বলের মাপে। বিশ্বাস হলো না! পরের দিন বাইরে বেরিয়ে দোকানটা দেখে এসেছিলাম।)
যাইহোক, আমি এবং আমার সঙ্গীরা সবাই সব খাবার শেষ করেছি। সবাই ভাবছি, কি করে খেলাম! খাওয়া দেখে তো মনে হলো যেন কোনো দুর্ভিক্ষ-পীড়িত জায়গা থেকে এলাম। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করলো খুব সুন্দর রান্না হয়েছে এবং প্রতিটা খাবার খুবই সুস্বাদু। পবনদার মুখে কিন্তু সেই হাসি আর বলছে,
– দাদা তো আগে থেকে বললেন না, ভালো কিছু করতে পারলাম না। তবে আজ রাত থেকে সব ভালো হবে, গুছিয়ে সময় নিয়ে জেনে নিয়ে করবো।
বলে কি লোকটা! তোমায় কিছু জানতে হবে না আর আমাদের কাছে। তোমার যা মন তাই খাওয়াও। আমার কিছু বলার নেই বা পছন্দ ও নেই। যা খাওয়াবে তাতেই হবে আমাদের। এই বলে দুপুরের ঘুম দিতে চলে গেলাম। যা খাওয়া হয়েছে এবার একটু ঘুম না হলে চলে।
বিকেলে ঘুম থেকে উঠে একটু এদিক-ওদিক হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো রাস্তার উপর বাগান ঘেরা এক ছোট্ট রেস্টুরেন্ট। সবাই মিলে ঢুকে পড়লাম একটু ভালো কফি বা চা এর লোভে। পরিবেশটা বেশ ভালো লেগে গেল। কি খাওয়া যায়, ভাবতে ভাবতেই ছেলে বলে দিল পনির পাকোড়া। কিছুক্ষন বাদেই বুঝলাম আরো দু এক প্লেট বলে দিলেই ভালো হতো। দিনের অতো খাবার কখন কিভাবে হজম করে ফেলেছি বুঝতেই পারি নি। যাই হোক, সন্ধের মধ্যে ফিরে এলাম আবার পবনদার আস্তানায়। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত বাড়ছে আর আমরা অপেক্ষায় আছি পবনদার পরের চমকের। সত্যি কথা বলতে, খিদেটাও বেশ পাচ্ছে মনে হচ্ছে। লজ্জার মাথা খেয়ে পবনদাকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে বললাম
– আর এক কাপ করে লিকার চা পাঠিয়ে দাও তো!

– চা? চা খেতে হবে না এতো রাত্রে আর। খিদে মরে যাবে তো! দশ মিনিট বসুন, এখুনি ডাকতে পাঠাচ্ছি রাত্রের খাবারের জন্য।
এতো আচ্ছা লোক! আমি চা খাবো না ভাত খাবো, কখন খাবো সবই ঠিক করে দেবে দেখছি। যাই হোক, কি আর করবো। বসে আড্ডা দিয়ে ঠিক দশ মিনিট বাদ খাবার টেবিলে বসে চোখ জুড়িয়ে গেল। আহা!
– সেই সকালের মতোই জুঁই ফুলের মতো সাদা সুগন্ধ ভাত, সবজি দেওয়া পুরু ডাল, বিন-আলু-টমেটো-মটরশুঁটি-বেগুন কুচি-কুচি করে ভাজা : এগুলো সবার জন্য আলাদা আলাদা করে সাজানো। আর শেষ বাটি টা পবনদা যখন নিজের হাতে নিয়ে এলো তখন তো আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। কি ছিল তাতে? পবনদার ভাষাতেই বলি:
– সকালেই দেখেছিলাম এই দেশী মুরগি টা হাটে। কেজি আড়াই মতো। ভাবলাম আপনারা তো পাঁচ জন। নিয়েই নিই। বলিনি আপনাকে। গোটা মশলা দিয়ে একটু ঝাল-ঝাল বানালাম। খেয়ে দেখুন তো কেমন লাগে?
টেস্ট পরে করবো, দেখেই তো লোভে পড়ে গেলাম। লালরঙের তেল পরিমান মতো ভাসছে। পিসগুলোও বেশ ওজনদার। ব্যাপারটার মধ্যে কেমন একটা বন্য বন্য ভাব আছে। ঝালটা বেশ মুখে লাগছে। ঝোল নয় আবার ভাতে মাখতেও অসুবিধা হচ্ছে না। আহা! কি স্বাদ। শুধু এই মাংস খাবার জন্য কয়েক মাইল হাঁটা যায়। যাই হোক, আবার কোনদিকে মনোযোগ না দিয়ে শুধুই খেতে থাকলাম।
দুবেলাই খাবার সময় যে পরিমান ভাত আমাদের থালায় দিচ্ছিলো, আমরা প্রায় চেঁচিয়ে উঠে কিছুটা করে অন্য একটা প্লেটে তুলে রাখছিলাম, কারণ প্রতিবারই মনে হচ্ছিলো, এতোটা ভাত আবার খাওয়া যায় নাকি! আমরা রাক্ষস নাকি! কিন্তু প্রতিবারই খাবার শেষে দেখছিলাম, কোথাও কিছু পড়েছিল না।
খেয়ে উঠে একটু ভয় ভয় করছিল। এই যে একে এতো পরিমান খাওয়া আর সঙ্গে এতো ঝাল-মশলা, কি হয় কে জানে!
পরের দিন সকালে উঠেই বুঝলাম, না, কিছু হবে না। সব খেতেই পারি আমরা।
সকালে উঠে ব্রেড-বাটার-ডিম ভাজা আর কলা খাইয়ে পবনদা বললো, যান একটু নদীর পাড় দিয়ে ঘুরে আসুন। ঘুরে এলাম। আর এসেই চান করে বসে গেলাম সেই নির্দিষ্ঠ টেবিলে। আজ একেবারে অন্য ভাবনায় রান্না। গতকালের মতো তাড়াহুড়ো করে দেওয়া নয়, গুছিয়ে সব পদ আলাদা আলাদা করে প্রত্যেককে ভাগ করে দেওয়া। কি ছিল?
– সরু চালের সাদা ভাত, পাতলা করে উচ্ছে ভাজা, বড়ি, আলু দিয়ে শাকের তরকারি, টমেটো দিয়ে মুসুর ডাল, ঝির-ঝিরে আলুভাজি, একটু ঝোল-ঝোল পেঁয়াজ পোস্ত যার মধ্যে সুন্দর কাঁচা তেল আর কাঁচা লঙ্কার গন্ধ। শেষ বাটিটা সবার জন্য একসাথে, শুরু করার পর পবনদা নিয়ে এসে নামায়। আজ সেটায় ছিল, সেই বিখ্যাত বারেলি মাছের সরষে দিয়ে ঝাল। আহা, মুখ ছেড়ে গেল! দেখেই আমরা সবাই
– আরে আরে, করেছ কি! এতো কে খাবে?
মিষ্টি করে হেসে পবনদা চলে গেল আর ফিরে এলো আরো তিনটে প্লেট নিয়ে। সেই কালকের মতোই চাটনি, পাঁপড় আর বড় সাইজের একটা করে মন্ডা নিয়ে। লালচে রঙের এই মন্ডা মুখে দিলেই মিলিয়ে যায় পুরো। খেয়ে উঠে মনে হল, স্বর্গ এখানেই। এই খাওয়া না খেলে কেন আমি বেড়াতে এলাম। বেড়াতে আসার যেন পুরো পয়সা উসুল হয়ে গেল। দুপুরে
ঘুমিয়ে, সন্ধ্যায় হাঁটা চলা সেরে রাত্রের টেবিলে হাজির আমরা। চিকেন কষা আর রুটি। সঙ্গে ডাল, সবজি, আর আলু ভাজা তো ছিলই। আচ্ছা, একটা কথা তো বলাই হয়নি। প্রতিদিনই কিন্তু সুন্দর করে পেঁয়াজ, শসা, টমেটো, লেবু, লঙ্কা কেটে সাজিয়ে দিত পবনদা।
এই দু দিন আমরা যে পরিমান খেয়েছি সবই পবনদার ভালোবাসায় আর আতিথেয়তায় গলে জল হয়ে। সত্যিই পবনদা এই দুদিনে আমাদের রাক্ষস বানিয়ে দিল। খাওয়াতে আমরা সত্যিই এখন রাক্ষস। ভুঁড়িটা দুদিনেই বেশ ঝুলে গেল মনে হচ্ছে!

আমার বাবা অতো লোভ নেই! চার-পাঁচ পিস হলেই হবে। (পর্ব:২)

পবনদার কাছে সকালের জলখাবারে ব্রেড-বাটার আর ডিম সেদ্ধ খেয়ে বেরুলাম মুর্তি ঘুরে ঝালঙের পাশে এক রেস্টুরেন্টে যাবো বলে। এখানেই আজ থাকবো। অবাক হবার কিছু নেই। এই সেই বিখ্যাত আর.জে রেস্টুরেন্ট যেটা প্রায় জলঢাকা নদীর উপর আর যার নীচে নদীর পাড়ে ওদের থাকার ব্যবস্থা আছে। ঘর নিয়ে কোনো কথা হবে না, পুরো ষ্টার ক্যাটাগরির। কিন্তু আমার চিন্তা তো শুধু খাওয়া নিয়ে। সেটা কেমন হবে! যদিও শুনেছি, সবাই ঝালং আর বিন্দু ঘুরতে গেলে এখানেই খায়। তাই আমরাও হাজির হলাম। ভুলি নি মাঝ রাস্তায় পাহাড়ী দোকানে মোমো খাওয়া। যাই হোক, দুপুরে খেতে বসলাম। সামনে পাহাড়ী নদী, ছাদের ঝোলা অংশে টেবিল চেয়ার নিয়ে আমরা। আসতে শুরু করলো প্লেট।

– সেই সরু সুগন্ধী চালের ভাত, ঝুরো আলু ভাজা, মিক্সড আচার, পাহাড়ী শাক, আলু আর বাঁশের আচার, বাঁধাকপির তরকারি, আলু দিয়ে ডিমের ঝাল আর সঙ্গে দু পিস করে চিকেন দিয়ে ঝোল।
না, কিছুই পরে ছিল না। সবারই প্লেট থেকেই মোটামুটি পিঁপড়ে এসে ফিরে যাবে। এখানকার খাবারের স্বাদ একটু অন্য রকম। পাহাড়ী এক গন্ধ আর সঙ্গে দুই ভায়ের ষ্টার হোটেলের অভিজ্ঞতা মিশিয়ে বেশ অন্য রকম। পেট ভর্তি হলো বা বলা যায় বেশীই হলো। নামলাম নদীতে। বিকাল হবার আগেই মনে হল যেন খিদে পাচ্ছে। বসে গেলাম আবার উপরের ছাদে। রাত্রের খাবারের প্ল্যান করতে করতে মোমো চলে এলো। চিকেন, ভেজ, ফ্রাই সব মোমোই চেখে দেখা হলো সুপ দিয়ে। রাত্রের খাওয়া শুরু হবে আটটার সময় কারণ একটু সময় নিয়ে তৈরী করে খেতে হবে।
রাত আটটায় রোহিত শুরু করলো বার-বি-কিউ। পাশে আমরা চেয়ার নিয়ে বসে। সুপ, স্যালাড আর চিকেন রোস্ট দিয়ে আমাদের রাতের খাবার শুরু হলো। একটার পর একটা স্টিক নামায় আর প্লেটে পড়তে না পড়তেই শেষ। অসাধারণ ম্যারিনেশন করেছিল চিকেনটার। কখন আমরা একটা গোটা মুরগি শেষ করে ফেলেছি গল্প করতে করতে তা বুঝিও নি। শেষ স্টিক নামতে একটু দেরী আছে। সবারই পেট ভর্তি কিন্তু মন বলছে আর একটু হলে হোক। সবাইকেই জিজ্ঞাসা করছে মাংকা যে কেউ আর নেবে। ঠিক তখন কবি বলে উঠলো: ‘আমার বাবা অতো লোভ-টোভ নেই, চার -পাঁচ পিস পেলেই হবে!’
শেষ স্টিকটায় আর তখন পাঁচ-ছ পিসই আছে। বুঝলাম, আমাদের সবারই মনের অবস্থা কবির মতোই। পেট যতই ভর্তি হোক, আর পাঁচ-ছ পিস পেলে ঠিকই উঠে যাবে। যাই হোক মন ভরে খেয়ে শুতে গেলাম।

খাবার দাও! খিদে পেয়েছে। খেতে দাও। (পর্ব: ৩)

খাবার দাও! খিদে পেয়েছে। খেতে দাও। (পর্ব: ৩)

ম্যাডামজী আর গোলগোল এর কথোপকথন:
-খাবার দাও!
-আঁ?
-খাবার দাও! খিদে পেয়েছে।
-কি খাবে? ছাতু দেবো?
-না, ছাতু খাবার নয়!
-তাহলে কি খাবে?
-চিকেন।
গোলগোল আর মাংকা, এই দুজনকে যদি কেউ দেখে তাহলে বলবে যে এদের জীবনে ধ্যান, জ্ঞান, লক্ষ্য সবই চিকেন খাওয়া কে কেন্দ্র করেই। এরা সব সময়, সব খাবার চিকেন দিয়ে খেতে পারে তা সে সকালের জলখাবার হোক আর বিকালের টিফিন হোক। যাই হোক, আজ আর কোনো রিস্ক নিই নি। আজ রাত্রের ফাগুর ভূত বাংলোতে শাহিদ ভাই বার-বি -কিউ করবে বলছে আর আমরা পাঁচজন খাবো তো তাই গত কয়েকদিনের খাওয়ার হাল চাল দেখে আমি ওটা দু কেজি চিকেন আনার কথা বলেছি। এখন দুপুরে ডিমের ঝাল, ঢেঁড়স-পিয়াঁজ ভাজা, আলু ভাজা, চাটনি, ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে শেষ পাতে একটা ছোট রসগোল্লা আর পাঁপড় খেয়ে সামনের বারান্দায় আরাম-কেদারায় আধো-ঘুমে। সময়মতোই সন্ধ্যা হলো। সামনের বাগানে শাহিদ ভাই সমস্ত জিনিস জোগাড় করে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আজ রাত্রের মেনু, বার-বি-কিউ চিকেন, স্যালাড আর ফ্রায়েড রাইস। রাইস টা নেওয়া থাক, যদি কারোর পেট না ভরে। শাহিদ ভাইয়ের চিকেন তৈরী করার পদ্ধতিটা কিন্তু একদম অন্যরকম। আগের দিন রোহিতের ছিল চরম প্রফেশনাল আর হোটেলের সেফ দুরস্ত রান্না। আর এটা হলো কিরকম এক রাস্টিক অনুভূতিপূর্ণ। যাই হোক, প্রতিটা মাংসের সামনে-পিছনে ক্যাপসিকাম, পেয়াঁজ আর টম্যাটো দিয়ে বার-বি-কিউ সস মাখিয়ে আগুনে উল্টে পাল্টে ঝলছে যখন সোনালী রঙের হয়ে আমাদের প্লেটে আসছিল, তখনই তা হারিয়ে যাচ্ছিল আমাদের মুখে।
দু কেজি চিকেন আর পরিমান মতো রাইস আমরা নিঃশব্দেই শেষ করলাম কোথাও এতটুকু বিরক্ত ছাড়া। আমরা এমনিতেই খুব ভালো। এতটুকু কোনো জ্বালা নেই। যা পাই তাই খাই, যতটা পাই ততটাই খায়।
খাবার শেষে, বেড়ানো শেষে আজও আমরা আলোচনা করি মাঝে মাঝে:

– চিকেনের পরিমানটা আর একটু বাড়িয়ে দিলে হতো!?
– ঠিকই, পরের বার থেকে আর ওই দুই-এক-আড়াই এসব ওজন না ভেবে গোটাগুটি পাঁচ কেজিই বলে দেবে।
অপেক্ষা করে আছি সেই পরেরবারের জন্য, কবে আমি পাঁচ কেজি চিকেনের অর্ডার করবো সন্ধ্যার বার-বি-কিউয়ের জন্য। অপেক্ষা। পেটুক-অপেক্ষা।।

Food Travel: Combining wine and dinner, I got winner.

□ লেখক : সাগর দাঁ
□ ছবি : স্বাতী দাঁ
□ লেখা ও ছবি পাঠানোর ঠিকানা : 
□ ইমেইল : [email protected] 
0 কমেন্ট
4

কমেন্ট করুন